বেইজিংয়ে ট্রাম্প-জিনপিং সাক্ষাৎ! মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা, কী কথা হল দুই নেতার? - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Thursday, May 14, 2026

বেইজিংয়ে ট্রাম্প-জিনপিং সাক্ষাৎ! মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা, কী কথা হল দুই নেতার?


ওয়ার্ল্ড ডেস্ক, ১৪ মে ২০২৬: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিরোধের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। দুই নেতার এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে এবং গোটা বিশ্ব এর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপল-এ ট্রাম্পকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান। দুই নেতা উষ্ণভাবে করমর্দন করেন এবং এরপর ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।


ট্রাম্প তাঁর প্রতিনিধিদল ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ। এ সময় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির অনার গার্ড ব্যাটালিয়নও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অফ অনার প্রদান করে। আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের পর দুই দেশের নেতাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা চলাকালে ট্রাম্প, চীনা প্রেসিডেন্টের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাঁকে একজন মহান নেতা বলে অভিহিত করেন। এদিকে, শি জিনপিংও বলেন যে, ৯ বছর পর ট্রাম্প চীনে আসায় তিনি আনন্দিত।


বৈঠকের শুরুতে ট্রাম্প প্রকাশ্যে শি জিনপিংয়ের প্রশংসা করেন এবং দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার আশা প্রকাশ করেন। তিনি শি জিনপিংকে একজন 'মহান নেতা' হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে ভালো হবে। তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য শি-কে ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, "প্রেসিডেন্ট শি, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এটি এমন এক সম্মান যা খুব কম মানুষই পেয়েছেন। আমি ওই শিশুদের দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছি। তারা ছিল সুখী, খুব সুন্দর। সামরিক ব্যবস্থা ছিল চমৎকার, কিন্তু ওই শিশুরা ছিল অসাধারণ এবং তারা অনেক কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে।"


ট্রাম্প বলেন যে, তাঁর এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব রয়েছে এবং দুই নেতা সবসময় আলোচনার মাধ্যমে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা একে অপরকে অনেক দিন ধরে চিনি। সম্ভবত আমাদের দুই দেশের কোনও প্রেসিডেন্টেরই এত দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল না। আমাদের সম্পর্ক চমৎকার। যখনই কোনও সমস্যা দেখা দিয়েছে, আমরা একসঙ্গে তার সমাধান করেছি। আমি আপনাকে ফোন করতাম, আপনি আমাকে ফোন করতেন এবং যখনই কোনও সমস্যা হতো, আমরা খুব দ্রুত সেটার সমাধান করে ফেলতাম। চীনের জন্য আপনি যে কাজ করেছেন, তার জন্য আপনার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আপনি একজন মহান নেতা।"


ট্রাম্প এও বলেন যে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণে আগ্রহী হয়ে তিনি বিশিষ্ট আমেরিকান ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে চীনে গেছেন। তিনি বলেন, "আমাদের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ও সেরা ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। তাঁরা সবাই চীনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।" এই বৈঠককে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেন যে, আমেরিকার মানুষ এই শীর্ষ সম্মেলনটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, "কেউ কেউ বলছেন এটি সর্বকালের বৃহত্তম শীর্ষ সম্মেলন হতে পারে।" ভাষণ শেষে ট্রাম্প বলেন, "আপনাদের বন্ধু হতে পারাটা সম্মানের এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আগের চেয়েও ভালো হতে চলেছে।"


এদিকে, শি জিনপিং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বলেছেন যে, বিশ্বের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনকে "প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার" হওয়া উচিৎ। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে শি জিনপিং বলেন যে, বিশ্ব বর্তমানে বড় ধরণের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং চীন-মার্কিন সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, "সারা বিশ্ব আমাদের এই বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্ব বর্তমানে এমন পরিবর্তনের সম্মুখীন হচ্ছে, যা গত একশ বছরে দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বিশ্ব একটি নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।"


শি জিনপিং দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি সংঘাত এড়িয়ে একটি নতুন ধরণের সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং যৌথভাবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে? তিনি জিজ্ঞাসা করেন, "চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি 'থুসিডাইডস ট্র্যাপ' থেকে বেরিয়ে এসে প্রধান দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের একটি নতুন মডেল তৈরি করতে পারবে? আমরা কি যৌথভাবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বিশ্বে বৃহত্তর স্থিতিশীলতা আনতে পারব? আমরা কি আমাদের জনগণ ও মানবতার জন্য একটি উন্নততর ভবিষ্যৎ গড়তে একসাথে কাজ করতে পারি?"


শি বলেছেন, এই প্রশ্নগুলো শুধু আমাদের দুই দেশের জন্যই নয় বরং সমগ্র বিশ্ব এবং ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, 'প্রধান দেশগুলোর নেতা হিসেবে তাঁকে এবং ট্রাম্পকে অবশ্যই একসাথে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।'



বিশেষজ্ঞদের মতে, শি জিনপিং একটি উদীয়মান শক্তি এবং একটি বিদ্যমান পরাশক্তির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার দিকে ইঙ্গিত করে 'থুসিডাইডস ট্র্যাপ'-এর কথা উল্লেখ করেছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম অ্যালিসনের জনপ্রিয় এই পরিভাষাটির অর্থ হল, যখন একটি নতুন শক্তি একটি বিদ্যমান বৈশ্বিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।



চীনের রাষ্ট্রপতি বলেছেন যে, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্যের চেয়ে অভিন্ন স্বার্থই বেশি। তিনি বলেন, "এক দেশের সাফল্য অন্য দেশের জন্য সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। স্থিতিশীল চীন-মার্কিন সম্পর্ক সমগ্র বিশ্বের জন্য মঙ্গলজনক। সহযোগিতা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে, আর সংঘাত তাদের ক্ষতি করবে। আমাদের অংশীদার হওয়া উচিৎ, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আমাদের একে অপরের সাফল্যকে সমর্থন করা উচিৎ এবং নতুন যুগে প্রধান দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্কের জন্য সঠিক পথ খুঁজে বের করা উচিৎ।"


নয় বছর পর চীনে আসায় শি জিনপিং ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আমেরিকার জনগণ এবং ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। জিনপিং বলেন, "বেইজিংয়ে আপনার সাথে দেখা করে আমি খুব খুশি। নয় বছর পর আবার আপনি চীনে এসেছেন। এই বছর আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী। আমি আপনাকে এবং আমেরিকার জনগণকে অভিনন্দন জানাই।" বৈঠকের শেষে, শি জিনপিং আশা প্রকাশ করেন যে, দুই দেশ যৌথভাবে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করবে।


এদিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সম্মান জানাতে একটি রাজকীয় ভোজসভারও আয়োজন করা হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই দিনের সফরে বুধবার চীনে পৌঁছেছেন। বেইজিংয়ে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান চীনের উপ-রাষ্ট্রপতি হান ঝেং। চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউও উপস্থিত ছিলেন। ২০১৭ সালের পর এটি ট্রাম্পের প্রথম চীন সফর। এর আগে গত অক্টোবরে বুসানে দুই নেতার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়। ট্রাম্পের চীন সফরের আগে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত চীনা দূতাবাস চীন-মার্কিন সম্পর্ক সম্পর্কিত কিছু সংবেদনশীল বিষয়ে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট দেয়।


উল্লেখ্য যে, এক্স-এ প্রকাশিত একটি পোস্টে দূতাবাস জানিয়েছে যে, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে চারটি অলঙ্ঘনীয় সীমা রয়েছে, যেগুলোকে লঙ্ঘন করা উচিৎ নয়। পোস্টে উল্লিখিত চারটি বিষয় হল তাইওয়ান প্রশ্ন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং চীনের উন্নয়নের অধিকার। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার এই বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad