কলকাতা, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:০৮:০১ : পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে তৎপরতা বেড়েছে। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বামফ্রন্ট কার্যত রাজনৈতিক প্রান্তিকে চলে যায়। একটানা ৩৪ বছর রাজ্য শাসন করলেও বর্তমানে লোকসভা কিংবা বিধানসভা—কোথাওই বাম দলগুলোর কোনও প্রতিনিধি নেই।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বাম দলগুলি ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছে। বিশেষ করে তাদের পুরনো মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের দিকে এগোচ্ছে সিপিএম।
মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে নজর বামেদের
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, বর্তমানে সেই হার বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এই মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে একজোটভাবে ভোট দিয়ে আসছে, যা মমতার বড় শক্তি।
এই ভোটব্যাঙ্কেই এবার হানা দিতে চাইছে সিপিএম। সেই লক্ষ্যেই তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হওয়া ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে জোট নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বাম নেতৃত্ব। মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস ঘিরে আলোচনায় আসা হুমায়ুন কবীর বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রে।
AIMIM ও ISF-কে নিয়ে বৃহত্তর মুসলিম জোটের চেষ্টা
হুমায়ুন কবীর ইতিমধ্যেই আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM)-এর সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করেছেন। বিহার বিধানসভা ও মহারাষ্ট্র পুরসভা নির্বাচনে ভালো ফল করার পর AIMIM এবার পশ্চিমবঙ্গেও প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা করেছে।
এছাড়াও আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির সঙ্গেও বামেদের কথাবার্তা চলছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে একাধিক মুসলিম দলকে এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা চলছে, আর বাম দলগুলি সেই জোটে শরিক হতে আগ্রহী।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট বাস্তবায়িত হলে মুসলিম ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা বাড়বে, যার পরোক্ষ লাভ হতে পারে বিজেপির।
মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
এই আবহেই বুধবার সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের সঙ্গে বৈঠক করেন হুমায়ুন কবীর। সূত্রের খবর, জোটের রূপরেখা ও আসন বণ্টন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। মূলত মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলার ২২টি আসনকে কেন্দ্র করেই এই বৈঠক।
হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদের ২২টি আসনের মধ্যে ৬টি সিপিএমকে এবং ৮টি কংগ্রেসকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। বাকি ১০টি আসনে তাঁর দল জনতা উন্নয়ন পার্টি লড়াই করতে চায়। হুমায়ুন কবীর নিজেই বৈঠকের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, আলোচনা ইতিবাচক ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে।
ওয়েইসির সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি
অন্যদিকে AIMIM-এর সঙ্গে জোট চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে হায়দরাবাদে ওয়েইসির সঙ্গে দেখা করবেন হুমায়ুন কবীর। সূত্রের দাবি, ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। AIMIM মালদা ও মুর্শিদাবাদের একাধিক আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা
উল্লেখ্য, গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও ISF একসঙ্গে লড়াই করলেও মাত্র একটি আসন জিতেছিল ISF। মুসলিম ভোট তখনও ব্যাপকভাবে তৃণমূলের পক্ষেই ছিল। ফলস্বরূপ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টানা তৃতীয়বার রাজ্যে সরকার গঠন করেন।
সেই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২১৫টি এবং বিজেপি ৭৭টি আসন পায়। বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়। ভোট শতাংশের হিসেবে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৮.০২ শতাংশ এবং বিজেপি ৩৮.১৫ শতাংশ ভোট।
বিজেপির অঙ্ক
বিজেপি গত নির্বাচনে তফসিলি জাতি ও উপজাতি ভোটের একটি বড় অংশ নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হলেও মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক থেকে এখনও অনেকটাই দূরে। তাই মুসলিম ভোট বিভাজন হলে তার রাজনৈতিক লাভ বিজেপির ঝুলিতেই যেতে পারে—এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবার মুসলিম ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়তে পারে গোটা নির্বাচনী ফলাফলে।

No comments:
Post a Comment