প্রেসকার্ড নিউজ বিনোদন ডেস্ক, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:০০:০১ : মৃত্যু এই শব্দটা শুনলেই মনে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। আমরা সবাই জানি, জন্ম হলে একদিন মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তবুও যখন বাড়ির উঠোনে কোনো প্রিয়জনের নিথর দেহ শায়িত থাকে, তখন সময় যেন থমকে যায়। চারদিকে কান্নার আওয়াজ, মন্ত্রোচ্চারণ, আর মাঝখানে সাদা কাপড়ে মোড়া দেহ সব মিলিয়ে এক গভীর আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
বিশেষ করে যদি মৃত্যু সূর্যাস্তের পরে হয়, তাহলে অনেক পরিবারে দাহক্রিয়া পরদিন সকাল পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। সেই দীর্ঘ রাতটিতে সাধারণত পরিবারের কেউ না কেউ মৃতদেহের পাশে বসে থাকেন। কিন্তু কেন এমন করা হয়? এটি কি শুধুই প্রথা, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর বিশ্বাস রয়েছে?
রাতে দাহক্রিয়া এড়ানোর কারণ
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সূর্যাস্তের পর দাহক্রিয়া করা শুভ মনে করা হয় না। প্রাচীন গ্রন্থ গুরুড় পুরানে উল্লেখ আছে যে রাতের সময়কে ‘তমোগুণ’-এর প্রভাবশালী সময় ধরা হয়। এই সময়ে নেতিবাচক শক্তির প্রভাব বাড়তে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়, যা আত্মার পরবর্তী যাত্রায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তাই অনেকেই মনে করেন, সূর্যের প্রথম আলোয় দাহক্রিয়া সম্পন্ন করা আত্মার শান্তির জন্য বেশি শুভ।
জ্যোতিষীয় কারণ
জ্যোতিষশাস্ত্রে ‘পঞ্চক’ সময়কে অশুভ ধরা হয়। এই সময়ে মৃত্যু হলে বিশেষ কিছু শাস্ত্রবিধি বা পূজা করা হয়। অনেক পরিবার এখনও পণ্ডিতের পরামর্শ ছাড়া শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন না। যদিও শহুরে জীবনে এসব নিয়ম কিছুটা শিথিল হয়েছে, তবুও ঐতিহ্যের প্রভাব আজও রয়ে গেছে।
বাস্তব ও সামাজিক কারণ
এটি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে।
মৃত্যুর পর দেহে পরিবর্তন শুরু হয়, তাই একে একা ফেলে রাখা নিরাপদ নয়
গ্রামীণ এলাকায় পশু-পাখির আক্রমণের সম্ভাবনা থাকত
ধূপ-ধুনো জ্বালিয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করা হয়
এইসব কারণ মিলিয়ে রাতভর মৃতদেহের পাশে থাকার প্রথা গড়ে উঠেছে।
আত্মা ও আবেগের সম্পর্ক
ধর্মীয় ধারণা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আত্মা কিছু সময় নিজের বাড়ি ও প্রিয়জনদের আশেপাশেই থাকে। এই সময় তাকে একা ফেলে রাখা ঠিক নয় বলেই মনে করা হয়।
অনেক পরিবার রাতভর ভজন বা নামসংকীর্তন করেন, যাতে পরিবেশ শান্ত ও পবিত্র থাকে।
এই প্রথা ভয়ের নয় বরং ভালোবাসা, সম্মান এবং বিদায়ের এক গভীর অনুভূতির প্রকাশ।
বদলে যাওয়া সময়
আজকের দিনে আধুনিক হাসপাতাল ও বিদ্যুৎচালিত শ্মশানে ২৪ ঘণ্টাই দাহক্রিয়া সম্ভব। তবুও বহু মানুষ এখনও ঐতিহ্য মেনে চলেন।
কারণ, এটি শুধু একটি নিয়ম নয়—প্রিয়জনকে শেষবার সম্মান জানানোর একটি মানসিক প্রক্রিয়া।
উপসংহার
রাতে মৃতদেহ একা না রাখার প্রথা ধর্মীয়, সামাজিক এবং বাস্তব তিন দিক থেকেই ব্যাখ্যা করা যায়। একে শুধুমাত্র কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও আবেগ।

No comments:
Post a Comment