ন্যাশনাল ডেস্ক, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ছোট হোক বা বড়, জীবনে কখনও উকুনের সমস্যায় ভোগেননি, এমন মানুষ কমই আছেন। কিন্তু এই উকুন যে কারও প্রাণটাই কেড়ে নিতে পারে একথা ভাবনাতেও আসবে না। তবে, এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে পড়শি রাজ্য উড়িষ্যায়। উকুনের সংক্রমণে ষষ্ঠ শ্রেণির লক্ষ্মীপ্রিয়া সাহুর মৃত্যুর ঘটনায় স্তম্ভিত গোটা দেশ। হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পুরীর বাসিন্দা ১২ বছর বয়সী ওই পড়ুয়া মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
জানা গিয়েছে, বালঙ্গা থানা এলাকার চম্পাগড়া সাহি এলাকার বাসিন্দা লক্ষ্মীপ্রিয়া সাহু। স্থানীয় একটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সে। পরিবারের সদস্যদের মতে, বেশ কয়েক মাস ধরেই উকুনের আক্রমণে সে কাহিল হয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে এটিকে সাধারণ সমস্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও সময়ের সাথে সাথে এর তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। তেল, শ্যাম্পু থেকে শুরু করে নানান ঘরোয়া টোটকাও কাজে আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে সংক্রমণ রোধে কিশোরীর মা তাকে মাথা ন্যাড়ার পরামর্শ দিলেও সে রাজি হয়নি।
এদিকে, সংক্রমণ তার মাথার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণের সাথে সম্পর্কিত দুর্গন্ধ এবং ক্রমবর্ধমান অস্বস্তির কারণে ওই কিশোরী মানসিকভাবেও অস্থির হয়ে পড়ে এবং বাইরে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। আর সবসময় চুল বেঁধে রাখায় তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও আক্রমণের এই তীব্রতা বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু কয়েকদিন আগে (শুক্রবার ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) হঠাৎ করেই লক্ষ্মীপ্রিয়ার রক্ত বমি শুরু হয়। তার পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে তাকে পুরী জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে, সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
কিশোরীর মা বলেন, 'তিন দিন আগে লক্ষ্মীর স্বাস্থ্যের হঠাৎ অবনতি ঘটে। সে রক্ত বমি করতে শুরু করে। দ্রুত তাকে পুরী জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তাররা তার চিকিৎসা শুরু করেন, কিন্তু ততক্ষণে সংক্রমণ অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে। সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, চিকিৎসার সময় তার মৃত্যু হয়।
টিওআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরী জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক অক্ষয় শতপথী জানান, কিশোরীর মৃত্যু উকুনের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ওষুধের প্রতিক্রিয়া বা মাথার তীব্র সংক্রমণের কারণে সেপটিসেমিয়ার কারণে হতে পারে। বারবার চুলকানির ফলে মাথায় ক্ষত হতে পারে, যাতে করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরণের সংক্রমণের যদি দ্রুত চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। মৃত্যুর সঠিক কারণ যদিও কেবল বিস্তারিত তদন্ত এবং চিকিৎসা পর্যালোচনার পরেই নিশ্চিত করা যাবে।
ভুবনেশ্বরের এইমসের চর্মরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডঃ চন্দ্র শেখর সিরকার কথায়, উকুনের আক্রমণ থেকে সেকেন্ডারি ইনফেকশন হতে পারে। সিনিয়র চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ মৈত্রেয়ী পান্ডাও বলেছেন যে, উকুনের আক্রমণ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যখন মাথার ত্বক ক্রমাগত আঁচড়ানোর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এটি সংক্রমণের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে, এটি সেপসিসের কারণ হতে পারে, যা খুবই বিপজ্জনক সংক্রমণ এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
ক্লিনিক্স ইন ডার্মাটোলজি জার্নালে প্রকাশিত ২০২২ সালের একটি গবেষণা, "দ্য ডার্কার সাইড অফ হেড লিস ইনফেস্টেশনস"-এ জর্জিয়ার একটি ১২ বছর বয়সী কিশোরীর মৃত্যুর উল্লেখ রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে, কিশোরীর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল এবং এর দ্বিতীয় কারণ উকুনের গভীর সংক্রমণের সাথে যুক্ত গুরুতর রক্তাল্পতা ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই ধরণের গুরুতর পরিণতি বিরল, তবে এটা দেখায় যে, যদি চিকিৎসা না করা হয় বা বিষয়টি গুরুতর হয়, তাহলে এটি কখনও কখনও মারাত্মক হতে পারে।
মাথায় উকুন একটি সাধারণ এবং চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, এগুলি চুলকানি এবং অস্বস্তির কারণ হয়, কিন্তু গুরুতর অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেয় না। তবে উকুনের উপদ্রব যদি তীব্র হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তাহলে ক্রমাগত আঁচড়ানোর ফলে মাথায় খোলা ঘা হতে পারে।
এই ঘা-গুলিতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে। সংক্রমণ যদি রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এটি সেপ্টিসেমিয়া হতে পারে, যা প্রাণঘাতী। বিরল ক্ষেত্রে, গভীর সংক্রমণ, গুরুতর রক্তাল্পতা বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ডাক্তাররা জোর দিয়ে বলেন যে, প্রাথমিক চিকিৎসা, ভালো স্বাস্থ্যবিধি এবং চিকিৎসা সেবা এই মারাত্মক পরিণতি প্রতিরোধ করতে পারে।

No comments:
Post a Comment