পশ্চিম এশিয়ার উত্তাল সমুদ্র এবং হরমুজ প্রণালীতে আসন্ন যুদ্ধের হুমকির মধ্যে, দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি লি জে-মিয়ং-এর ভারত সফর বিশ্ব কূটনীতির অলিগলিতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সিউল ও নয়াদিল্লির মধ্যকার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দুই গণতান্ত্রিক পরাশক্তির অস্তিত্ব ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিষয়ক অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।
রাষ্ট্রপতি লি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার এই বর্তমান যুগে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার একত্রিত হওয়া কেবল সময়ের দাবিই নয়, বরং একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্যও বটে। ভারত সফরে থাকা রাষ্ট্রপতি লি জে-মিয়ং একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে সেই কৌশলগত অংশীদারিত্বের সূক্ষ্ম দিকগুলো তুলে ধরেছেন, যা আগামী দশকগুলোতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
তিনি হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উল্লেখ করেন যে, এই সমুদ্রপথটি উভয় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য জীবনরেখাস্বরূপ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সামুদ্রিক পথের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত একসঙ্গে কাজ করছে। জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্যকরণ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমন্বয় সাধন এই অংশীদারিত্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
সাক্ষাৎকারের সময় রাষ্ট্রপতি লি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও আবেগাপ্লুত হয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ একজন পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের মতো মনে হয়েছে, কারণ উভয় নেতাই 'জনকেন্দ্রিক রাজনীতি'-তে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। এই ব্যক্তিগত বোঝাপড়া বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং উচ্চ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে জটিল আলোচনাকে সহজতর করছে।
ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (CEPA) উন্নত করার চলমান প্রক্রিয়াটি অটোমোবাইল এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো ঐতিহ্যবাহী খাতের বাইরে গিয়ে জাহাজ নির্মাণ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে 'মেক ইন ইন্ডিয়া, টুগেদার উইথ কোরিয়া' স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দুই দেশের প্রতিশ্রুতির একটি প্রমাণ। প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভর ভারত উদ্যোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থন একটি নতুন কৌশলগত মাত্রা যোগ করছে। কে৯ বজ্র হাউইটজার প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে রাষ্ট্রপতি ব্যাখ্যা করেন যে, এর দ্বিতীয় পর্যায়ের ৬০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন কাজ ভারতেই করা হচ্ছে। এটি কেবল অস্ত্র বিক্রি নয়, বরং ভবিষ্যতের সামরিক প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং যৌথভাবে উৎপাদনের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ।
এছাড়াও, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহের জন্য চীনের উপর নির্ভরতা কমানো উভয় দেশের জন্যই একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের বিপুল খনিজ সম্পদ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার রিচার্জেবল ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন তৈরির সক্ষমতার সমন্বয়ে এমন একটি সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি হতে পারে, যা বিশ্ব বাজারে চীনের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতার বিষয়ে বলতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি লি সিউলের ভূমিকাকে একটি "সেতু" হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে কোনো একক দেশ এই বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
ভারত-নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক ওশেনস ইনিশিয়েটিভে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উভয় দেশই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পরিশেষে, এই সফর এবং রাষ্ট্রপতি লি-র দূরদর্শী পরিকল্পনা ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বন্ধুত্বের এক শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করছে, যা শুধু এশিয়াতেই নয়, সারা বিশ্বে সমৃদ্ধি ও শান্তির ভিত্তি হয়ে উঠবে।

No comments:
Post a Comment