রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর আগে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তার এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। হুগলির আরামবাগে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বহু মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’-এ পাঠানোর আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সেই ভয় থেকেই সোমবার দুপুরে ছ’জন বাসিন্দা মহকুমা শাসকের দফতরে গিয়ে দেশের রাষ্ট্রপতির কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানান। এই ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
সোমবার মহকুমা শাসকের দফতরের সামনে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখা যায়। শরীরে নিজেদের পরিচয়পত্রের কপি সেঁটে ছ’জন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হন। তাঁরা সকলেই আরামবাগ পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। জানা গেছে, ওই একটি ওয়ার্ড থেকেই এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে ২০৬ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, তাঁরা জন্মসূত্রে এই দেশের নাগরিক, কিন্তু নাম বাদ যাওয়ার পর তাঁরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তাঁদের বক্তব্যে গভীর হতাশা ফুটে উঠেছে। তাঁদের কথায়, “আমরা স্বাধীন দেশে জন্মেছি ও বড় হয়েছি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমরা আবার যেন পরাধীন হয়ে পড়েছি।” তাঁদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে তাঁদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হতে পারে। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য—“সেখানে অমানবিক জীবনযাপনের চেয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুই শ্রেয়। তাই রাষ্ট্রপতির কাছে মৃত্যুর অনুমতি চেয়েছি।”
এসআইআর সংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত মোট ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫ জনের নাম বিভিন্ন ধাপে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। খসড়া তালিকা থেকে চূড়ান্ত তালিকা পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকা প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষের নাম শেষ পর্যন্ত বাতিল হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হয়েছে। এক পক্ষের অভিযোগ, এই পরিস্থিতির জন্য বিরোধী দল ও নির্বাচন কর্তৃপক্ষ দায়ী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এনআরসি ও ডিটেনশন ক্যাম্পের ভয় ছড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে পাল্টা অভিযোগ উঠেছে, ইচ্ছাকৃতভাবে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাজনৈতিক লাভ তুলতে চাওয়া হচ্ছে।
ভোটের আগে যেখানে উন্নয়নের বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা, সেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া এবং তার জেরে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন—গণতন্ত্রের এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরছে। এখন প্রশ্ন, এত মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া এই অনিশ্চয়তা কবে কাটবে এবং তাঁদের মনে জমে থাকা আতঙ্ক দূর হবে কীভাবে?

No comments:
Post a Comment