আইপ্যাক থেকে কয়লা কেলেঙ্কারি! ভোটের আগে রাজ্যে ইডির কড়া অভিযান - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Sunday, April 12, 2026

আইপ্যাক থেকে কয়লা কেলেঙ্কারি! ভোটের আগে রাজ্যে ইডির কড়া অভিযান



কলকাতা, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:৫০:০১ : রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট একের পর এক বড় পদক্ষেপ নিয়ে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, অবৈধ আদায়, জমি দখল, নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং আন্তর্জাতিক হাওলা চক্রের বিরুদ্ধে কড়া অভিযান শুরু করেছে। গত কয়েক দিনে রাজ্যের বিভিন্ন মামলায় তল্লাশি, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, সমন জারি এবং চার্জশিট দাখিলের মতো একাধিক বড় পদক্ষেপ সামনে এসেছে। এইসব পদক্ষেপে রাজনৈতিক নেতা, আধিকারিক, ব্যবসায়ী এবং অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত বহু ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। চলুন ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি কেলেঙ্কারি এবং সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ সম্পর্কে জানা যাক।



প্রথমে আইপিএসি মামলার কথা বলা যাক। ২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট দেশের একাধিক শহরে—হায়দরাবাদ, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, বিজয়ওয়াড়া এবং রাঁচিতে—একযোগে ১১টি জায়গায় তল্লাশি চালায়। এই তল্লাশি আইপিএসি-র কার্যালয়, তার পরিচালকদের বাড়ি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির অফিসে হয়। তদন্তে এমন নথি ও ডিজিটাল প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা অর্থ পাচার এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক হাওলা চক্রের ইঙ্গিত দেয়। এখন তদন্তকারী সংস্থা খতিয়ে দেখছে, নির্বাচনী কার্যকলাপের নামে কোনো অবৈধ অর্থের ব্যবহার হয়েছে কি না। এই মামলায় তল্লাশির সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নথি নিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনাও সামনে আসে, যা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত তিরস্কার করে।



পার্থ চট্টোপাধ্যায় মামলায় চাপ বাড়িয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। ১১ এপ্রিল ২০২৬-এ কলকাতায় তাঁর বাড়ি এবং সহযোগী প্রসন্ন কুমার রায়ের দফতরে তল্লাশি চালানো হয়। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে তাঁকে তিনবার সমন পাঠানো হলেও তিনি একবারও হাজির হননি। ২০২২ সালে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালে তিনি শর্তসাপেক্ষ জামিন পান। এখন প্রাথমিক শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক এবং গ্রুপ সি-ডি নিয়োগ সংক্রান্ত একাধিক মামলায় তদন্ত চলছে।




‘সোনা পাপ্পু’ নামে পরিচিত বিশ্বজিৎ পোদ্দারের বিরুদ্ধেও বড় অভিযান চালানো হয়েছে। ১ এপ্রিল কলকাতায় ৮টি জায়গায় তল্লাশিতে প্রায় ১.৪৭ কোটি টাকা নগদ, ৬৭ লক্ষ টাকার সোনা-রুপোর গয়না, একটি গাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়। বাড়ি থেকে বিদেশে তৈরি একটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার হয়। তদন্তে জানা যায়, এই চক্রটি তোলাবাজি, জমি দখল এবং অবৈধ নির্মাণের মাধ্যমে বিপুল কালো টাকা তৈরি করছিল। বর্তমানে অভিযুক্ত পলাতক এবং সমনের পরও তদন্তে যোগ দিচ্ছে না। এই মামলায় আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং এক পুলিশ আধিকারিকের যোগসূত্রের কথাও উঠে এসেছে।



অমিত গাঙ্গুলী মামলায় ২৮ মার্চ ২০২৬-এ কলকাতায় ৭টি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। অভিযোগ, ভুয়ো চুক্তিপত্র, ক্ষমতাপত্র এবং নকল নথি তৈরি করে দামী জমি দখল করা হত। পরে সেই জমিতে নির্মাণ করে সাধারণ মানুষকে বিক্রি করা হত। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ পাচারও করা হয়েছে। একাধিক ব্যাংক হিসাব বন্ধ করা হয়েছে এবং ২০টিরও বেশি অভিযোগ আগে থেকেই নথিভুক্ত ছিল।



সরকারি রেশন কেলেঙ্কারিতেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১০ এপ্রিল ২০২৬-এ ১৭টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে জানা যায়, দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ গম বাজারে এবং বিদেশে বিক্রি করা হচ্ছিল। খাদ্য কর্পোরেশনের বস্তা বদলে গমের পরিচয় মুছে ফেলা হত। এই অভিযানে প্রায় ৩১.৯ লক্ষ টাকা এবং বহু ডিজিটাল প্রমাণ উদ্ধার হয়েছে।



মার্লিন গোষ্ঠী সংক্রান্ত মামলায় ৮ এপ্রিল ২০২৬-এ ৭টি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। অভিযোগ, ভুয়ো নথির মাধ্যমে জমি দখল করে বড় নির্মাণ প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। তদন্তে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক সংযোগের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।



এনআরআই কোটা চিকিৎসা ভর্তি কেলেঙ্কারিতেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৮৫ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে। ভুয়ো নথির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হয়েছে বলে অভিযোগ।



কয়লা কেলেঙ্কারিতে ৯ এপ্রিল ২০২৬-এ বিশেষ আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। তদন্তে জানা যায়, কয়লা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হত। গত পাঁচ বছরে এইভাবে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।



সাউথ পয়েন্ট বিদ্যালয়ের অর্থ কেলেঙ্কারিতে প্রায় ১৮.৫ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অভিযোগ, ভুয়ো বিল, নকল কর্মচারী এবং বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের তহবিল আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং পরে তা বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করা হয়েছে।



এক স্থগিত কাস্টমস আধিকারিকের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রায় ৪৮ লক্ষ টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অভিযোগ, ২০১৭ সালে ১৯৪ কোটি টাকার পণ্য বেআইনি উপায়ে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল এবং তদন্ত এড়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত পরীক্ষা চালানো হয়।



সব মিলিয়ে, রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান চলছে। কয়লা, নিয়োগ, জমি বা হাওলা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তদন্তকারী সংস্থা সক্রিয়। আগামী দিনে আরও বড় প্রকাশ এবং গ্রেফতারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad