নিজস্ব প্রতিবেদন: বীরভূমে রাজ্য পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও সোনা উদ্ধারের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বুধবার ভোররাতে অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের এক আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি সোনার বার উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। উদ্ধার হওয়া নগদ ও সোনার মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ভোর প্রায় ৩টা নাগাদ মিনার মণ্ডলের বাড়িতে অভিযান শুরু হয়। প্রথমে বাড়ির দরজা না খোলায় পরে দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালানো হয়। বাড়ির একটি ঘরের আলমারিতে কাগজ ও কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা পাওয়া যায়। এরপর পাঁচটি নোট গোনার মেশিন এনে টাকা গণনার কাজ শুরু হয়, যা শেষ হতে প্রায় ১৯ ঘণ্টা সময় লাগে। পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিওগ্রাফিও করা হয়েছে।
রাতের সাংবাদিক বৈঠকে বীরভূম জেলা পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের সময় বাড়ির মালিক ও সন্দেহভাজন মিনার মণ্ডল দাবি করেছেন, উদ্ধার হওয়া অর্থ টুলু মণ্ডল এবং তাঁর সিন্ডিকেটের। পুলিশ সুপার জানান, এই অর্থ ও সোনার উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে গ্রেফতারির সম্ভাবনাও রয়েছে।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নগদ অর্থ ও সোনায় লেনদেন চলত। উদ্ধার হওয়া সম্পদের উৎস অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি বাসের চালক হিসেবে পরিচিত হলেও মিনার মণ্ডল পাথর খাদান ও খনি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বীরভূমের বিতর্কিত পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের একাধিক খাদানের ব্যবসায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে একজন বাসচালকের বাড়িতে এত বিপুল সম্পদ কীভাবে এল, তা নিয়েই এখন নানা প্রশ্ন উঠছে।
টুলু মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই বীরভূমের প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। অতীতে অবৈধ পাথর খাদান এবং গরু পাচার সংক্রান্ত মামলায় তাঁর নাম উঠে এসেছিল। ২০২২ সালে প্রয়োগকারী সংস্থা (ইডি) তাঁর বাড়ি ও একাধিক জায়গায় তল্লাশিও চালায়। নতুন করে এই বিপুল নগদ ও সোনা উদ্ধারের পর সেই সমস্ত অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক মাধ্যমে রাজ্য পুলিশ, বীরভূমের ডিআইজি ও এসপির ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বালি ও পাথর মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রশংসা করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথাও উল্লেখ করেন।
এদিকে টুলু মণ্ডলকে ঘিরে আরও একটি পুরনো ঘটনা ফের আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালে সিউড়িতে তাঁর মেয়ের বিয়ে ঘিরে বিলাসবহুল আয়োজন ব্যাপক চর্চার বিষয় হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে বলিউড ও টলিউডের একাধিক তারকা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন মহলের দাবি, ওই বিয়েতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। অতিথিদের মধ্যে অঙ্কুশ হাজরা, দর্শনা বণিক, আরবাজ খান, জারিন খান ও আফতাব শিবদাসানির মতো পরিচিত মুখ ছিলেন।
বর্তমান তদন্তে সেই জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের ব্যয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও তদন্ত বা সেলিব্রিটিদের জিজ্ঞাসাবাদের ঘোষণা করা হয়নি। তবে বিপুল নগদ ও সোনা উদ্ধারের ঘটনার পর পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত আরও বিস্তৃত হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অর্থ ও সোনার প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং এর সঙ্গে কোনও অবৈধ আর্থিক লেনদেন বা সিন্ডিকেটের যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

No comments:
Post a Comment