রাশিয়ার তেল কিনলেই ১০০% শুল্ক? ভারতের উপর ট্রাম্পের ‘ট্যারিফ বোমা’! - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Saturday, August 8, 2026

রাশিয়ার তেল কিনলেই ১০০% শুল্ক? ভারতের উপর ট্রাম্পের ‘ট্যারিফ বোমা’!


 রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন সেনেটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় একটি নতুন রাশিয়া-নিষেধাজ্ঞা বিল পাস হয়েছে। এই বিল আইনে পরিণত হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে।

তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন—এই মুহূর্তে ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসেনি। সেনেটে বিলটি পাস হয়েছে মাত্র। এখন সেটি মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে যাবে। এরপর হাউস ও সেনেটের প্রক্রিয়া শেষ হয়ে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন পেলে তবেই এটি আইনে পরিণত হতে পারে।

কী বিল পাস হয়েছে?

বিলটির নাম ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’। প্রয়াত মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে এই আইনটির নামকরণ করা হয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ব্যবস্থা এতে রয়েছে।

৭ আগস্ট মার্কিন সেনেটে বিলটি ৮৬-১১ ভোটে পাস হয়। অর্থাৎ, দুই দলেরই উল্লেখযোগ্য সমর্থন ছিল। বিলটির মূল লক্ষ্য রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিক্রি থেকে পাওয়া রাজস্ব কমানো এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষমতার উপর চাপ তৈরি করা।

ভারত কেন এই বিলের আওতায় আসতে পারে?

বিলটিতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নতুন আইনি কাঠামো অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্দিষ্ট দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবেন।

মার্কিন সেনেটরদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের সবচেয়ে বড় আমদানিকারকদের মধ্যে থাকা দেশগুলিকে লক্ষ্য করতে পারে। ভারত ও চিন এই তালিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশ।

অর্থাৎ, ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখে এবং বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তাহলে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

‘১০০ শতাংশ শুল্ক’ মানে কী?

সহজ ভাষায়, কোনও ভারতীয় পণ্য আমেরিকায় প্রবেশের সময় যদি তার মূল্য ১০০ টাকা হয় এবং তার উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়, তাহলে শুল্ক বাবদ আরও ১০০ টাকা দিতে হতে পারে।

তবে বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। শুল্কের প্রভাব নির্ভর করবে কোন পণ্যের উপর কত হার বসানো হচ্ছে, মার্কিন প্রশাসন কীভাবে তা প্রয়োগ করছে এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের মধ্যে সেই অতিরিক্ত খরচ কীভাবে ভাগ হচ্ছে তার উপর।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিলটি ১০০ শতাংশ শুল্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বসিয়ে দিচ্ছে না। এটি প্রেসিডেন্টকে এমন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করছে।

কেন রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতকে চাপ দেওয়া হচ্ছে?

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার জ্বালানি থেকে পাওয়া আয় কমানোর চেষ্টা করছে। কারণ রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ দেশটির অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।

ভারত অবশ্য রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার বিষয়ে নিজের অবস্থান বজায় রেখে এসেছে। সস্তা রুশ তেল ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের উৎস হয়ে উঠেছে।

মার্কিন আইনপ্রণেতাদের যুক্তি হলো, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতাদের উপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা গেলে রাশিয়ার জ্বালানি-রাজস্ব কমানো সম্ভব হবে।

আমেরিকার মধ্যেই কেন আপত্তি?

এই প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতেও বিতর্ক রয়েছে।

সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, প্রেসিডেন্টকে এত ব্যাপক শুল্ক ক্ষমতা দেওয়া হলে তা আমেরিকার অর্থনীতি ও বাণিজ্যনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের কিছু আইনপ্রণেতাও প্রেসিডেন্টের হাতে অতিরিক্ত শুল্ক ক্ষমতা তুলে দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে বিলটির সমর্থকদের যুক্তি, রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলির উপর শক্তিশালী অর্থনৈতিক চাপ তৈরি না করলে মস্কোর উপর যুদ্ধ বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করা কঠিন হবে।

ভারতের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব কী?

বিলটি আইনে পরিণত হয়ে বাস্তবে প্রয়োগ করা হলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সেগুলি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্পের আমেরিকায় বড় বাজার রয়েছে, তাদের উপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর ফলে—

ভারতীয় পণ্যের আমেরিকায় প্রবেশের খরচ বাড়তে পারে।

ভারতীয় রপ্তানিকারকদের লাভের মার্জিন কমতে পারে।

কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকান ক্রেতারা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য কিনতে পারেন।

ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে ভারতকে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার নীতি নিয়ে কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

তবে এই মুহূর্তে কতটা ক্ষতি হবে, তা নির্ভর করছে বিলটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয় কি না এবং প্রেসিডেন্ট বাস্তবে কত শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন তার উপর।

এখন কী হবে?

সেনেটে পাস হওয়ার পর বিলটি এবার মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে যাবে। হাউসে বিলটি নিয়ে আলোচনা ও ভোট হবে। এরপর আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার জন্য নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

তাই এখনই বলা ঠিক হবে না যে ‘ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসে গেছে’।

সঠিক তথ্য হলো—

মার্কিন সেনেটে এমন একটি বিল পাস হয়েছে, যা আইন হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাশিয়ার বড় তেল-গ্যাস ক্রেতা দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দিতে পারে। ভারত সেই সম্ভাব্য লক্ষ্য দেশগুলির মধ্যে রয়েছে।

এখন মূল নজর মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে।

বড় প্রশ্ন—ভারত কি রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করবে?

এই বিলের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক প্রভাব এখানেই। আমেরিকার চাপের উদ্দেশ্যই হল রাশিয়ার জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে ভারতসহ বড় ক্রেতাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করা।

কিন্তু ভারতের জন্য বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। রাশিয়া থেকে তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে তেল পাওয়া ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ফলে সামনে ভারতকে একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, মার্কিন সেনেটের এই ভোট ভারতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad