ওয়ার্ল্ড ডেস্ক, ০৬ আগস্ট ২০২৬: প্রায় দু'বছর অন্তরালে থাকার পর বুধবার প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর নয়াদিল্লীতে সরাসরি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতার সুযোগ দেওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বাংলাদেশ বলেছে, এটি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার পরিপন্থী এবং এর ফলে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। এতে বাংলাদেশের নাগরিকদের অপমান করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
ঢাকা ট্রিবিউন ও অন্যান্য বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা এ বিষয়ে ভারত সরকারকে তাদের উদ্বেগের কথা ইতিমধ্যেই জানিয়েছে। ঢাকা বলেছে, তারা ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, এ ধরণের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশ আরও বলেছে যে, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর একটি আক্রমণ এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি একটি অপমান। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বারবার অনুরোধ করা হয়েছে, কিন্তু ভারতের কাছ থেকে এখনও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।
তারা বিবৃতিতে দিয়ে বলেছে, 'গণহত্যার দায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত ও পলাতক শেখ হাসিনাকে আজ সন্ধ্যায় নয়াদিল্লীতে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ তীব্র ক্ষোভপ্রকাশ করছে। সেখানে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ ও তার জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভারত সরকারের কাছে আগেই উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও এই প্রকাশ্য অনুষ্ঠানটি আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে। যে দিন বাংলাদেশের জনগণ 'জুলাই বিপ্লব'-এর দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে, সে দিন ভারতীয় ভূখণ্ডে শেখ হাসিনার এই কথোপকথন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহিদদের প্রতি চরম অপমান হিসেবে গণ্য হচ্ছে।'
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'শাস্তিপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী হাসিনা এবং তাঁর মাফিয়া চক্রের বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কোনও স্থান হবে না। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সার্বভৌমের সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে একটি গঠনমূলক, পারস্পরিক ভাবে লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। এর বিপরীতে, যে কোনও অজুহাতে তাঁকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়াটা আমাদের জনগণের আবেগে গভীর আঘাত হানে এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।'
উল্লেখ্য, এই ঘটনার আগেও বাংলাদেশ ভারতকে একই ধরণের সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তবে, ভারত মঙ্গলবারেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, শেখ হাসিনার অনলাইন সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনার সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, "আপনারা যে সংবাদ সম্মেলনের কথা বলছেন, তা একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যম সংস্থা আয়োজন করছে। এতে সরকারের কোনও ভূমিকা নেই এবং এই প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত কোনও মতামতকে সরকার সমর্থন করে না।"
এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি অবশ্যই স্বদেশে ফিরবেন এবং এর জন্য যেকোনও মূল্য দিতে প্রস্তুত। বুধবার সাংবাদিকদের ভার্চুয়ালি সম্বোধন করেন। দুই বছর পর প্রথমবারের মতো সরাসরি সম্প্রচারে এসে শেখ হাসিনা বলেন, কারারুদ্ধ বা নিহত হলেও তিনি অবশ্যই স্বদেশে ফিরবেন। ২০২৪ সালে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে বসবাস করছেন।
শেখ হাসিনা জানান, তিনি এ বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান এবং উপযুক্ত সময়ে তারিখ ঘোষণা করবেন। তিনি বলেন, "আমি এখানে চিরকাল থাকতে পারি না, একদিন আমাকে আমার জনগণের কাছে ফিরতে হবে। আমি ফিরতে চাই কারণ জনগণ নিরাপত্তা ও উন্নয়নের দাবিদার এবং তারা গণতন্ত্রেরও দাবিদার। এখানে প্রশ্ন হল বাংলাদেশকে সঠিক পথে, উন্নয়ন, শান্তি ও ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে নিয়ে যাওয়া।" শেখ হাসিনা বলেন, তিনি জানেন ঢাকায় ফিরলে সরকার তাকে গ্রেফতার বা আটক করার চেষ্টা করবে, কিন্তু তিনি ভয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ১৯৮৩ সাল থেকে তাঁকে সাতবার গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাঁকে মারার ১৯টি চেষ্টা করা হয়েছে।
এছাড়াও ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেই বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল না। তিনি অভিযোগ করেন, সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো সরকার পরিবর্তনের চেষ্টায় ছাত্রদের ব্যবহার করেছিল। সব সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল এবং টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের নৃশংসভাবে খুন ও গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং এই পরিস্থিতি আজও অব্যাহত রয়েছে। হাসিনা বলেন, সেখানে সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, বিচারপতি এবং সাধারণ মানুষ এখনও নির্যাতিত হচ্ছেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায় আসার পরেও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি।

No comments:
Post a Comment