ন্যাশনাল ডেস্ক, ২৫ অক্টোবর ২০২৬: ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং। শত্রুদেশ পাকিস্তানকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় পশ্চিম সীমান্তে ১২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে এবং ২০০ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত ভারতীয় বায়ুসেনার নির্ভুল হামলা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কোনও লক্ষ্যই তাদের নাগালের বাইরে নয়। বায়ুসেনা প্রধানের এই মন্তব্যকে পাকিস্তানের প্রতি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
রবিবার সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এয়ার চিফ মার্শাল এ পি সিং বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ বায়ুসেনার সক্ষমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির যথার্থতা প্রমাণ করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যে কোনও সঙ্কটের সময় সবার আগে পদক্ষেপ করা এবং শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখার কার্যকর সামরিক শক্তি হিসেবে বায়ুসেনার নির্ণায়ক ভূমিকা এই অভিযান আরও একবার প্রতিষ্ঠা করেছে।
তবে বায়ুসেনা প্রধান সতর্ক করে বলেন, বায়ুসেনার এই দৃষ্টিভঙ্গির সাফল্য প্রমাণিত হয়েছে মানেই যে আমাদে এখানেই থেমে থাকতে হবে, এমনটা নয়। তাঁর কথায়, “আমাদের সক্ষমতাকে আরও মজবুত করতে হবে এবং তার পরিধি বাড়াতে হবে।” 'অপারেশন সিঁদুর’-এর চার দিন ধরে অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বায়ুসেনা প্রধান বলেন, “সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল, আমাদের হাতে সব সময় একাধিক বিকল্প থাকা প্রয়োজন। শত্রুপক্ষ কৌশল পরিবর্তন করলে দ্রুত তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও বজায় রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, “সক্ষমতাভিত্তিক বাহিনী এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকে। কারণ, তারা কোনও একটি মাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরণের উপকরণ ব্যবহার করতে পারে। এই নমনীয়তার কারণেই আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী পাল্টা পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে পেরেছিলাম এবং সংঘাতের বিস্তার রুখতে সফল হয়েছিলাম।”
উল্লেখ্য, পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার জবাবে শুরু হয়েছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’। গত বছরের মে মাসে এই অভিযানের আওতায় পাকিস্তান এবং পাকিস্তান অধিকৃত এলাকায় থাকা জঙ্গি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ভারত। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের অন্যতম সাহসী সামরিক অভিযান ছিল এটি।
এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং বলেন, “অপারেশন সিঁদুর প্রমাণ করে দিয়েছে আমরা যে পথ বেছে নিয়েছি, তা সঠিক। আরও বেশি দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আমরা এই পথেই এগিয়ে যাব। যাতে ভবিষ্যতে দেশের প্রয়োজনে ভারতীয় বায়ুসেনা আরও দ্রুত, আরও নিখুঁত এবং আরও নির্ণায়কভাবে নিজেদের শর্তে পদক্ষেপ করতে পারে।”
বায়ুসেনা প্রধান আরও জানান, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বেশ কয়েকটি অস্ত্রব্যবস্থা অভিযানে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে। শত্রুপক্ষের ভূখণ্ডের গভীরে প্রবেশ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতেও সক্ষম হয়েছে সেগুলি। একই সঙ্গে গোটা অভিযান জুড়ে অন্য কোনও ব্যক্তি বা সম্পত্তির ক্ষতি না করার প্রতিশ্রুতিও পালন করেছে ভারতীয় বায়ুসেনা। এয়ার চিফ মার্শাল সিং বলেন, “অপারেশন সিঁদুর মূলত বায়ুসেনার সক্ষমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির যথার্থতা প্রমাণ করেছে। আমরা এখন আলাদা আলাদা বিমান ও অস্ত্রব্যবস্থার পরিবর্তে সামগ্রিক সক্ষমতার ভিত্তিতে চিন্তাভাবনা করি। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি বিমান, নজরদারি সেন্সর, অস্ত্র এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অপারেশন সিঁদুরের সময় সামরিক অভিযানে এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং তা সফল হয়েছে। দেশের যে কোনও সঙ্কটের সময় দ্রুত পদক্ষেপ করা এবং শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখার কার্যকর সামরিক শক্তি হিসেবে বায়ুসেনার নির্ণায়ক ভূমিকা এই অভিযান ফের প্রমাণ করেছে। পাশাপাশি, দ্রুততা, নির্ভুলতা, বিভিন্ন ব্যবস্থার সমন্বয় এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার গুরুত্বও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় গৃহীত কৌশল, সামরিক বিকল্প, চ্যালেঞ্জ এবং আঘাত হানার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে বায়ুসেনা প্রধান জানান, এই অভিযানের সাফল্যের পিছনে কোনও একটি অস্ত্র বা যুদ্ধবিমানের ভূমিকা ছিল না বরং নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, নেটওয়ার্কভিত্তিক অভিযান, শত্রুপক্ষের অস্ত্রের পাল্লার বাইরে থেকে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র, নির্ভুল নিশানায় আঘাত করার ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং চালকবিহীন আকাশযান মোকাবিলার সক্ষমতা—সবকিছুর সম্মিলিত প্রয়োগেই সাফল্য এসেছে। এই সমস্ত ব্যবস্থা একক ব্যবস্থার মতো সমন্বিতভাবে কাজ করেছে বলেই অভিযান সফল হয়েছে।

No comments:
Post a Comment