কুমোরের চাকায় পুজোর গন্ধ, ধুনুচি-প্রদীপ গড়তে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Sunday, October 11, 2026

কুমোরের চাকায় পুজোর গন্ধ, ধুনুচি-প্রদীপ গড়তে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা


নিজস্ব সংবাদদাতা, পশ্চিম মেদিনীপুর: দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের তালে ধুনুচি নৃত্য। বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই নৃত্য পুজো মণ্ডপগুলিতে আগের তুলনায় কিছুটা কম দেখা গেলেও দুর্গাপুজোর সঙ্গে ধুনুচির যোগ আজও অটুট। ধুনুচিতে নারকেলের ছোবড়া ও ধুনো জ্বালিয়ে ঢাকের তালে বিভিন্ন কায়দায় নাচের সেই দৃশ্য এখনও বাংলার পুজোর অন্যতম পরিচিত ছবি। সামনেই দুর্গাপুজো। তাই ধুনুচি থেকে প্রদীপ—পুজোর নানা মাটির সামগ্রী তৈরিতে এখন ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা। 


মেদিনীপুর শহরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাবাজারের কুমোরপাড়ায় এখন এক মুহূর্তও ফুরসত নেই শিল্পীদের। ধুনুচি, মাটির প্রদীপ, সরা, জাকপ্রদীপ, জাক হাঁড়ি, দ্বারঘট, স্ট্যান্ড প্রদীপ-সহ পুজোর নানা সামগ্রী তৈরিতে দিনরাত এক করে কাজ করছেন তাঁরা। বিভিন্ন দোকান ও পুজো কমিটির কাছ থেকে বরাত যেমন আসছে, তেমনই খুচরো বিক্রিও চলছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্ত অর্ডার পৌঁছে দিতে পরিবারের পুরুষ, মহিলা থেকে ছোটরাও কাজে হাত লাগিয়েছেন।


কুমোরপাড়ার বাড়ির উঠোন, রাস্তার ধারে কিংবা ছাদ—সর্বত্র সারি দিয়ে শুকোতে দেওয়া হয়েছে ধুনুচি, প্রদীপ-সহ নানা মাটির সামগ্রী। রোদে শুকোনো, রোদ থেকে ঘরে তুলে নেওয়া, ভাটিতে পোড়ানো—সব কাজই চলছে একসঙ্গে। তারই মধ্যে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অর্ডার নিয়ে কথাবার্তাও চলছে। তবে এ বছর আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় কাজ কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছে বলে জানাচ্ছেন শিল্পীরা। বৃষ্টির কারণে কিংবা পর্যাপ্ত রোদ না ওঠায় মাটির সামগ্রী ঠিকমতো শুকোতে দেওয়া যায়নি। আবার মাটির জিনিস পোড়ানোর জন্য কাঠের জোগান নিয়েও সমস্যা হয়েছে। বেশিরভাগ কাঠ ভেজা থাকায় ভাটিতে পোড়ানোর কাজ ব্যাহত হয়েছে। এখন রোদ ওঠায় সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে জোরকদমে কাজ চলছে।


কুমোরের চাকায় মাটি ফেলে আঙুলের কারসাজিতে একের পর এক সামগ্রী তৈরি করছেন শিল্পীরা। ধুনুচি তৈরির কাজও বেশ কয়েকটি ধাপে হয়। প্রথমে তৈরি হয় ধুনুচির উপরের গোল অংশ, আলাদাভাবে তৈরি করা হয় নিচের স্ট্যান্ড এবং হাতল। পরে তিনটি অংশ জুড়ে তৈরি হয় সম্পূর্ণ ধুনুচি। একসময় হাতে ঘোরানো কুমোরের চাকাই ছিল ভরসা। এখন অধিকাংশ শিল্পী বৈদ্যুতিক চাকা ব্যবহার করছেন। এতে সময় অনেকটাই কম লাগে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তবে মাটির সামগ্রী তৈরির খরচ বেড়ে যাওয়ায় চিন্তায় মৃৎশিল্পীরা। 


মির্জাবাজারের মৃৎশিল্পী উত্তম পাল জানান, আগে এক বস্তা মাটির দাম ছিল ২২০-২৩০ টাকা। এখন বস্তাপিছু প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে মাটির জিনিস পোড়ানোর কাঠের দামও বেড়েছে। আগে প্রতি ক্যুইন্টাল ৮০০-৯০০ টাকায় কাঠ পাওয়া গেলেও এখন তা প্রায় ১২০০ টাকা ক্যুইন্টাল দরে কিনতে হচ্ছে। ধুনুচির দাম আকার ও ধরণ অনুযায়ী ১০ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। 


উত্তম পালের দাবী, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ধুনুচির চাহিদা বেশ ভালো। মৃৎশিল্পী মলয় দাসও জানিয়েছেন, পুজোর সময় ধুনুচি-সহ বিভিন্ন মাটির সামগ্রীর চাহিদা বরাবরই থাকে। তবে মাটি, কাঠ-সহ উৎপাদনের উপকরণের দাম বাড়লেও সেই অনুযায়ী মাটির সামগ্রীর দাম বাড়ানো কঠিন। দাম বাড়ালে অনেক ক্রেতাই তা কিনতে চাইছেন না।


সব মিলিয়ে পুজোর আগে মির্জাবাজারের কুমোরপাড়ায় এখন শুধুই ব্যস্ততার ছবি। কুমোরের চাকায় ঘুরছে মাটি, ভাটিতে পুড়ছে মাটির সামগ্রী, উঠোনে সারি দিয়ে শুকোচ্ছে ধুনুচি-প্রদীপ। আর সেই মাটির ধুনুচিই কয়েকদিন পর ধুনোর ধোঁয়া আর ঢাকের তালে ফিরিয়ে আনবে বাংলার পুজোর চেনা আবহ।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad