তেল আমদানিতে ভারতের কৌশলের প্রশংসা, মার্কিন চাপের তত্ত্ব খারিজ রুবিওর - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Thursday, October 22, 2026

তেল আমদানিতে ভারতের কৌশলের প্রশংসা, মার্কিন চাপের তত্ত্ব খারিজ রুবিওর


ওয়ার্ল্ড ডেস্ক, ২২ অক্টোবর ২০২৬ : অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বৈচিত্র্য আনার ভারতের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে দেশের নিজস্ব স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই নেওয়া হয়েছে। এর পিছনে আমেরিকার কোনও চাপ কাজ করেনি। এমনটাই জানালেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও। তিন দিনের ভারত সফরে আসা রুবিও 'ইন্ডিয়া টুডে’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, কোনও একটি দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার সময় সমস্যায় পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি। তাই জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একাধিক উৎসের উপর নির্ভর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


রুবিওর কথায়, “ভারত তার জ্বালানি আমদানিতে উৎসে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কোনও ধরণের হুমকি বা এই ধরণের কোনও চাপের কারণে ভারত এই পদক্ষেপ করেনি।” বিষয়টি ভারতের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল, কারণ রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ক্রয় নিয়ে ভারত ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।


প্রসঙ্গত, রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। এই নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভারতের মতপার্থক্যও তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রুবিওর এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।


গত বছর রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনার প্রসঙ্গ তুলে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট শুল্কের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। ওয়াশিংটনের দাবী ছিল, রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার ফলে প্রাপ্ত অর্থ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কোর যুদ্ধকে আর্থিকভাবে সহায়তা করছে। এমনকি ট্রাম্পের উপদেষ্টা পিটার নাভারো ভারতকে ‘ক্রেমলিনের অর্থ সাদা করার ধোপাখানা’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। তবে চলতি বছরের গোড়ার দিকে অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়।


ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানির উৎস সম্প্রসারণ করেছে। যদিও এখনও রাশিয়াই ভারতের বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী দেশ। তবে তথ্য বলছে, ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশীদারিত্ব ৪৬.৬ শতাংশ থেকে কমে ৩৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।


গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানিয়েছিলেন, ভারতের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। আগে ২৭টি দেশ থেকে তেল আমদানি করত ভারত। বর্তমানে সেই সরবরাহকারী দেশের সংখ্যা বেড়ে ৪১ হয়েছে।


কেন্দ্রীয় সরকার বরাবরই জানিয়ে এসেছে, দেশের জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও বলেন, ভারতের এই কৌশলকে শুধু রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিৎ নয়।


রুবিওর কথায়, “বিষয়টি রাশিয়ার কাছ থেকে কম তেল কেনার চেয়ে আমেরিকা, ভেনেজুয়েলা কিংবা পশ্চিম গোলার্ধের অন্যান্য দেশ থেকে আরও বেশি অপরিশোধিত তেল কেনার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। আমার মনে হয়, এটি ভারতের স্বার্থের অনুকূল। আর এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করতে চাই।”


ভারতের তেল পরিশোধন শিল্পের প্রশংসা করতে গিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও। তাঁর কথায়, তেল পরিশোধনের ক্ষেত্রে ভারতের যথেষ্ট দক্ষতা ও সক্ষমতা রয়েছে। শুধু পরিশোধনের পরিমাণ বাড়ানোই নয়, অল্প সময়ের মধ্যেই এমন বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার ক্ষমতাও ভারতের রয়েছে, যা দেশটির তেল পরিশোধন ক্ষমতাকে আরও সম্প্রসারিত করতে পারে।


রুবিও বলেন, “ ভারতের কাছে প্রকৃত সক্ষমতা রয়েছে তেল পরিশোধনের পরিমাণ বাড়ানো। আরও বেশি তেল পরিশোধনের ক্ষমতা ভারতের রয়েছে। পাশাপাশি, খুব অল্প সময়ের মধ্যে এমন বিনিয়োগের ব্যবস্থাও করতে পারে ভারত, যা তার পরিশোধন ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।”


এর আগে, বুধবার রিলায়েন্সের জামনগর শিল্পাঞ্চল পরিদর্শনের সময় ভারতকে ‘তেল পরিশোধনের ক্ষেত্রে মহাশক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন রুবিও। ভারত ও আমেরিকার মধ্যে জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার উদ্যোগের মধ্যেই তাঁর এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।


গত সপ্তাহে রাশিয়া-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে ভারতের জ্বালানি আমদানি নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। ওই নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক চলতি সপ্তাহে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। সেগুলি কার্যকর হলে ভারতীয় পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের বোঝা চাপতে পারত।


এটা এমন সময়ে হল, যখন ট্রাম্প আমেরিকায় রাশিয়ার ডিজেল আমদানির জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। ইউক্রেন এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন যে, রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লক্ষ টন ডিজেল ‘আমেরিকা ও বিশ্ববাজারে’ সরবরাহ করবে।


ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষে সওয়াল করে রুবিও বলেন, বিদেশনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একাধিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিষয় বিবেচনা করতে হয়। কোনও সিদ্ধান্তকে শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করা উচিৎ নয়। রুবিও বলেন, “যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তবে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই যুদ্ধের যে প্রভাব পড়ছে, সেটাও আমরা চিনতে পারি।”


তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সারা বিশ্বেই ডিজেলের দাম বেশি।”


ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে ১০-এর মধ্যে কত নম্বর দেবেন, এই প্রশ্নের মুখেও কূটনৈতিক সতর্কতা বজায় রাখেন মার্কো রুবিও। সরাসরি কোনও নম্বর দিতে রাজি হননি তিনি। মার্কিন বিদেশসচিব বলেন, “আমি এই সম্পর্ককে কোনও নির্দিষ্ট নম্বর দিতে চাই না। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক।”


জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে ঘিরে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad