লাইফস্টাইল ডেস্ক, ২৯ অক্টোবর ২০২৬: কিডনির সমস্যা মানেই কোমরের দু’পাশে ব্যথা বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া—এমন ধারণা অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কিডনির অসুখের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গই দেখা যায় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে শরীরে এমন কয়েকটি পরিবর্তন দেখা দেয়, যেগুলিকে সাধারণ ক্লান্তি, ঘুমের অভাব কিংবা দৈনন্দিন শারীরিক সমস্যার লক্ষণ বলে অনেকে ভুল করেন। অথচ এই পরিবর্তনগুলির পিছনে থাকতে পারে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত। তাই শরীরের অচেনা উপসর্গগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
কিডনির অন্যতম প্রধান কাজ হল রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে বের করে দেওয়া। পাশাপাশি শরীরে জল ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই অঙ্গ। কিডনির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিডনি রোগের কোন অচেনা কিছু লক্ষণ-
১. সারাক্ষণ ক্লান্তি ও দুর্বলতা
পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও যদি সারাদিন ক্লান্ত লাগে, কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হয় বা শরীরে শক্তির অভাব অনুভূত হয়, তা হলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমে থাকা এবং রক্তাল্পতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে দুর্বলতা ও ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। তবে এই উপসর্গের পিছনে রক্তাল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা বা ঘুমের ঘাটতির মতো অন্য কারণও থাকতে পারে।
২. চোখের চারপাশে ফোলাভাব
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের চারপাশে অস্বাভাবিক ফোলাভাব দেখা যাচ্ছে? বিশেষত এই সমস্যা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন বেরিয়ে গেলে শরীরে তরলের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। তার ফলে চোখের চারপাশে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। তবে অ্যালার্জি ও অন্যান্য সমস্যাতেও এমন উপসর্গ হতে পারে। তাই ক্রমাগত এইসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৩. পা, গোড়ালি বা মুখ ফুলে যাওয়া
কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে অতিরিক্ত তরল জমতে পারে। এর ফলে পা, গোড়ালি কিংবা মুখে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ফোলাভাবের সঙ্গে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি চিকিৎসা নিন।
৪. প্রস্রাবের ধরণে পরিবর্তন
প্রস্রাবের রং, পরিমাণ বা স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিবর্তন কিডনির সমস্যার একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে।
যেমন-
- প্রস্রাবে বারবার অতিরিক্ত ফেনা দেখা দেওয়া।
- প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া।
- রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া।
- প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া।
প্রস্রাবে ফেনা হওয়া মানেই কিডনির রোগ নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ফেনা হলে প্রস্রাবে প্রোটিনের উপস্থিতি পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে, অন্য কোনও উপসর্গ না থাকলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।
৫. ত্বকে চুলকানি ও শুষ্কতা
ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়া কিংবা কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে চুলকানি কিডনির উন্নত পর্যায়ের অসুখে দেখা দিতে পারে। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে খনিজ ও অন্যান্য পদার্থের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে, যা চুলকানির কারণ হতে পারে। তবে ত্বকের শুষ্কতা, অ্যালার্জি ও অন্যান্য রোগেও একই সমস্যা দেখা যায়।
৬. ক্ষিদে কমে যাওয়া ও বমি বমি ভাব
কিডনির কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমতে পারে। এর ফলে ক্ষিদে কমে যাওয়া, খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব কিংবা মুখে অস্বাভাবিক স্বাদ অনুভূত হতে পারে। এই উপসর্গগুলি দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।
৭. রাতে পেশিতে টান ধরা
রাতে ঘুমের মধ্যে বারবার পায়ের পেশিতে টান ধরলে অনেকেই একে সাধারণ ক্লান্তি বলে মনে করেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে কিডনির সমস্যার সঙ্গে শরীরে তরল ও খনিজের ভারসাম্যহীনতার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে পেশিতে টান ধরার আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই শুধু এই উপসর্গ দেখে কিডনির রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।
৮. মনোযোগের অভাব ও ঘুমের সমস্যা
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা কিংবা মানসিক অবসাদ দেখা দিতে পারে। রক্তাল্পতা, শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমে থাকা এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তবে এই ধরনের উপসর্গের পিছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
কিডনির রোগের লক্ষণ সব সময় স্পষ্ট হয় না। তাই কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গ না থাকলেও নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ কিংবা কিডনির রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করানো উচিৎ।

No comments:
Post a Comment