হাজার কোটি টাকা তছরুফকারী সহ ৬ বাংলাদেশিকে পাকড়াও করল ইডি - press card news

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Saturday, 14 May 2022

হাজার কোটি টাকা তছরুফকারী সহ ৬ বাংলাদেশিকে পাকড়াও করল ইডি


আর্থিক তছরুপের অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে পলাতক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাঙ্ক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডর প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার)-কে আটক করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ‘এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট’ (ইডি)। শুক্রবারই অশোকনগর সহ রাজ্যের অন্তত ৯ টি জায়গায় মূলত পি কে হালদার, পৃথ্বীশ কুমার হালদার, প্রাণেশ কুমার হালদার ও তাদের সহযোগীদের খোঁজে অভিযান চালায় ইডির আধিকারিকরা। আদতে বাংলাদেশের বাসিন্দা হলেও এদের সকলের বিরুদ্ধেই অবৈধ উপায়ে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। 


এর মধ্যে অশোকনগরেরই অন্তত পাঁচ-ছয়টি জায়গায় রাতভর অভিযান চলে। অবৈধ আর্থিক লেনদেনের খোঁজে অভিযান চালানো হয় অশোনকগর গোলবাজারের একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কেও। শনিবারও অশোকনগর, কাটোয়া সহ রাজ্যের বেশ কয়েকটি জায়গায় চলে ইডি’র তল্লাশি অভিযান।


অবশেষে এদিন সকালের দিকে একটি গোপন আস্তানা থেকে ইডির তদন্তকারী অফিসারেরা মূল অভিযুক্ত পি কে হালদারকে আটক করে বলে খবর।


এদিকে আটক বা গ্রেফতারের বিষয়ে ইডি’র তরফে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি জারি করা না হলেও সূত্রে খবর, প্রশান্তের ভাই প্রাণেশ কুমার হালদার, পৃথ্বীশ হালদার সহ মোট ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। যার মধ্যে এক নারীও রয়েছেন।


এদিন বিকালেই প্রশান্ত, প্রাণেশ, পৃথ্বীশ ও অভিযুক্ত নারীকে কলকাতার কাছেই সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে স্থিত ইডির দফতরে নিয়ে আসা হয়। চলে দফায় দফায় জেরা।


আটকের প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ লুকিয়ে প্রশান্ত হালদার কিছু না বললেও তার ভাই প্রাণেশ হালদার বলেন, ‘প্রশান্ত আমার দাদা। আমি মা’য়ের চিকিৎসার জন্য ভারতে আসি।’ যদিও অর্থ পাচার বা আত্মসাতের বিষয়ে কিছুই বলতে চান নি তিনি।’


জানা গেছে, বাংলাদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত প্রশান্ত হালদারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয় বাংলাদেশে। গত ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর পি কে হালদারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ না ছাড়তে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু তার পরেই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সে ভারতে প্রবেশ করে বলে জানতে পেরেছে ইডি।


এও জানা যায়, এই রাজ্যেই শিবশঙ্কর হালদার নাম নিয়ে বসবাস শুরু করে প্রশান্ত হালদার এবং এদেশেই রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড এবং আধার কার্ড বানিয়েছিল সে। তবে প্রশান্তই নয়, তার সহযোগীরাও এদেশে প্রবেশ করে স্থানীয় সব নথিই সংগ্রহ করেছিল। 


ইডির তদন্তকারী অফিসারদের ধারণা বাংলাদেশ থেকে হাওলার মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ দিয়ে এই রাজ্য সহ অন্য জায়গায় কারখানা খোলার পাশাপাশি কলকাতার অভিজাত এলাকা ও একাধিক জায়গায় স্থাবর সম্পত্তি কিনেছিল পি কে হালদার। আর এই কাজে তাকে সহায়তা করেছিল সুকুমার মৃধা নামে তারই এক সহযোগী।  


এর আগে শুক্রবারই সুকুমার মৃধার অশোকনগরের ১৬২/৮ দক্ষিণ পল্লীর বাড়িতে টানা ১০ ঘন্টা অভিযান চালিয়ে জমির একাধিক দলিল, বাংলাদেশি ফোন নাম্বার ও নথি সংগ্রহ করে নিয়ে যায় ইডি। এর পর রাতেই বাড়িটিকে সিলগালা করে দেয় ইডি’র আধিকারিকরা। সুকুমারের বাড়ির প্রধান ফটকে ইডি’র তরফে একটি নোটিশ টাঙিয়ে ‘প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট’এর ১৭ ধারার ১এ উপধারায় তার সম্পত্তিও ফ্রিজ করার কথা বলা হয়।


শনিবার সকালে সেই খবর জানাজানি হতেই সুকুমারের বাড়ির বাইরে ভিড় জমান অনেক উৎসাহী মানুষ। বাইরে থেকে উঁকি মেরে অনেকেই ভিতরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করেন। তবে গোটা ঘটনাটি জেনে অনেকেই হতবাক হয়ে ওঠেন। এদিন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রচুর অর্থের মালিক হওয়ায় জমিদারের মতো চলাফেরা করতো সুকুমার।


এব্যাপারে স্থানীয় এক বাসিন্দা বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী জানান, ‘সুকুমার মৃধা খুবই বিত্তশালী ব্যক্তি। তার প্রচুর অর্থ আছে এবং জমিদারের মত ঠাঁটবাট নিয়ে চলাফেরা করত সে। ফলে অনেক মানুষই তার পিছনে ঘুরঘুর করত।’ তিনি আরও জানায়, ‘এলাকায় প্রচুর সম্পত্তির অধিকারী সুকুমারের বেশ কয়েকটি বাড়ি ছিল। কিন্তু আমাদের কারওই কোনও সন্দেহ হয় নি, তার কারণ অনেকেই বাংলাদেশ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে এসে এপার বাংলায় বাড়ি ঘর তৈরি করেন। আমরাও তেমনই ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন জানতে পারছি বাংলাদেশে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ’এর সাথে জড়িত।’  


এদিকে পি কে হালদারের দুই সহযোগী স্বপন মৈত্র ও উত্তম মৈত্র নামে সম্পর্কে দুই ভাইকেও আটক করেছে ইডি। আদতে বাংলাদেশি হলেও দুই দেশের পাসপোর্টের অধিকারী এবং নাগরিকত্ব রয়েছে স্বপন ও উত্তমের। শুক্রবারই স্বপন মিত্রের বাড়িতেও প্রায় ১৮ ঘন্টা তল্লাশি অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু নথি সংগ্রহ করেছে ইডি।


এব্যাপারে উত্তমের স্ত্রী রচনা মৈত্র শনিবার জানায়, ‘ইডির আধিকারিকরা স্বপন ও উত্তম নামে দুই ভাইকে আটক করে নিয়ে গেছে।’ তিনি আরও জানান, ‘স্বপন পেশায় মৎস্য ব্যবসায়ী। উত্তম তার ভাইকে সহায়তা করতেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তার দেখাতেই দেড় বছর আগে কলকাতায় আসি। কিন্তু করোনার কারণে দেশে ফেরা সম্ভব হয় নি।’ তিনি এও স্বীকার করেন, বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতেও রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড- সবকিছুই আছে।’  


শুক্রবার গভীর রাতে সুকুমারের জামাই সম্পর্কে সঞ্জীব হাওলাদারের বাড়িতেও প্রায় ৭ ঘন্টা ধরে ইডির তল্লাশি চলে। সেখান থেকে সঞ্জীবের মোবাইল ফোন, বেশ কিছু নথি ও ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে। পাশাপাশি সঞ্জীবকে তদন্তে সহায়তা করারও নির্দেশ দেওয়া হয়।


উল্লেখ্য বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুরোধেই পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই অভিযান। সেক্ষেত্রে আর্থিক তছরুপের মামলায় জড়িত সন্দেহে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তাদের সহযোগীদের আত্মগোপন করে থাকার সম্ভাব্য স্থানগুলিতেই কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে এই অভিযান চালানো হয়।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad