প্রেসকার্ড নিউজ বিনোদন ডেস্ক, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:০০:০২ : যখন কোনও বয়োজ্যেষ্ঠ আমাদের মাথায় হাত রেখে বলেন “সুখে থাকো” বা “সবসময় সফল হও”, সেই মুহূর্তে এক অদ্ভুত উষ্ণতা অনুভূত হয়। এটি কেবল শব্দের প্রভাব নয়—স্পর্শের মাধ্যমে এক ধরনের মানসিক শক্তি ও আশ্বাস আমরা পাই, যা শৈশব থেকেই পরিচিত। লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রায় সব সংস্কৃতিতেই আশীর্বাদ দেওয়ার সময় ডান হাত ব্যবহার করার রীতি রয়েছে। কিন্তু কেন? এটি কি শুধুই প্রথা, নাকি এর পেছনে আছে গভীর কোনও অর্থ?
ভারতীয় বিশ্বাস অনুযায়ী ডান হাত দিয়ে আশীর্বাদ করার রীতি জ্যোতিষ, যোগশাস্ত্র এবং আচরণবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত। সেই কারণেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অভ্যাস আজও সমানভাবে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য।
ডান হাত দিয়ে আশীর্বাদের প্রথা
জ্যোতিষশাস্ত্রে ডান হাতের গুরুত্ব
ভারতীয় জ্যোতিষ মতে, শরীরের ডান দিক সূর্যের শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরা হয়। সূর্যকে প্রাণশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের প্রতীক মনে করা হয়। তাই ডান দিককে সক্রিয় ও ইতিবাচক শক্তির বাহক বলা হয়। বিশ্বাস করা হয়, যখন কেউ ডান হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেন, তখন তিনি নিজের শুভ শক্তি অপরের মধ্যে সঞ্চার করেন। এই কারণে আশীর্বাদের স্পর্শকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শক্তি বিনিময়ের একটি প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
শুভ–অশুভের সাংস্কৃতিক ধারণা
ভারতীয় সংস্কৃতিতে ডান হাতকে শুভ কাজের জন্য নির্ধারিত মনে করা হয়। পূজা, প্রসাদ বিতরণ, দান বা যজ্ঞ এসব ক্ষেত্রেই ডান হাতের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। ধীরে ধীরে এটি সামাজিক শিষ্টাচারের অংশ হয়ে ওঠে। কারও সঙ্গে করমর্দন করা বা কিছু তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ডান হাত ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে ওঠে। আশীর্বাদ দেওয়াও সেই ধারারই অংশ।
যোগশাস্ত্র ও পিংগলা নাড়ি
যোগদর্শনে শরীরের তিনটি প্রধান নাড়ির কথা বলা হয়—ইড়া, পিংগলা ও সুষুম্না। এর মধ্যে পিংগলা নাড়িকে শরীরের ডান অংশের সঙ্গে যুক্ত মনে করা হয়। এটি উষ্ণতা, কর্মশক্তি ও সক্রিয়তার প্রতীক। তাই ডান হাতকে অধিক প্রভাবশালী শক্তির বাহক হিসেবে দেখা হয়।
শক্তি সঞ্চারের ধারণা
অনেকের মতে, ডান হাত দিয়ে মাথায় হাত রাখার মধ্যে মানসিক আশ্বাস ও শক্তি সঞ্চারের অনুভূতি কাজ করে। এই স্পর্শে মানুষ নিজেকে নিরাপদ ও সমর্থিত মনে করে যা মূলত আবেগের গভীর সংযোগের ফল।
বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি
আধুনিক বিজ্ঞান জানায়, শরীরের ডান দিক নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের বাম অংশ, যা যুক্তিবোধ, ভাষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। অধিকাংশ মানুষ ডানহাতি হওয়ায় এই হাত তুলনামূলকভাবে বেশি নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছন্দ। ফলে ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করলে আত্মবিশ্বাস ও স্থিরতার অনুভূতি প্রকাশ পায়, যা সামনে থাকা ব্যক্তির মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রজন্মান্তরের অভ্যাস
ছোটবেলা থেকে আমরা যেভাবে বড়দের আশীর্বাদ নিতে দেখি, সেটিই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। বিয়ে, উৎসব বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ডান হাতের ব্যবহার তাই প্রথায় পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রথা ও যুক্তির মিলন
ডান হাত দিয়ে আশীর্বাদ দেওয়ার রীতি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়। এতে প্রতীকী ভাবনা, যোগের শক্তি ধারণা এবং মনোবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা—সব মিলেই এক সমন্বয় দেখা যায়। তাই যখন কোনও বয়োজ্যেষ্ঠ ডান হাত মাথায় রাখেন, তখন তা শুধু একটি আচার নয় বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা বিশ্বাস, স্নেহ ও মানসিক সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।

No comments:
Post a Comment