কলকাতা, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৭:২০:০১ : পশ্চিমবঙ্গে চলমান স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হয়। এই শুনানিতে সবচেয়ে বেশি নজর ছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। তিনি নিজেও আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং বিচারপতিদের কাছে কথা বলার অনুমতি চান।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমি কি কিছু বলতে পারি? আমি এই রাজ্যের মানুষ। আমরা কোথাও ন্যায় পাচ্ছি না।” তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনকে ছয়বার বিস্তারিত চিঠি পাঠানো হলেও কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তিনি কোনও দলের স্বার্থে নয়, সাধারণ মানুষের ন্যায়ের জন্য লড়াই করছেন।
মমতার বক্তব্য শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাব তলব করেছে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ৯ ফেব্রুয়ারি।
শুনানির সময় মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, SIR-এর মূল উদ্দেশ্য ভোটার যোগ করা নয়, বরং ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনও মেয়ের বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে তথ্যের গরমিল হওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই কারণেই নাম কাটা হচ্ছে।
এ সময় আদালত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাজ্যের হয়ে সওয়াল করার জন্য শ্যাম দিওয়ান, কপিল সিব্বলদের মতো অভিজ্ঞ আইনজীবী উপস্থিত আছেন। প্রধান বিচারপতি জানান, কোনও নির্দোষ ভোটারের নাম যাতে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে আদালত চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যেই ১০ দিনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে, এর বেশি সময় বাড়ানো সম্ভব নয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গকেই টার্গেট করা হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, “অসম বা উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে কেন একইভাবে SIR হচ্ছে না?” তিনি বলেন, বহু মানুষ চাষের কাজে ব্যস্ত থাকার সময়েই নোটিস পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, BLO-দের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, আধারের পাশাপাশি আরও নানা সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে, যা অন্য রাজ্যে বাধ্যতামূলক নয়। নির্বাচনের ঠিক আগে মাত্র দুই মাসে এমন একটি প্রক্রিয়া চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সাধারণত সম্পন্ন হতে দু’বছর সময় লাগে। দরিদ্র মানুষ কাজের খোঁজে স্থানান্তরিত হলে তাঁদের নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে—যা আদালতের নির্দেশের পরিপন্থী বলে তাঁর দাবি।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বরাবরই আগ্রাসী অবস্থানে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে বিহারের SIR নিয়েও তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। এবার নিজের রাজ্যে একই প্রক্রিয়া চলায় তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।
এই মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি বিপুল এম পঞ্চোলির বেঞ্চ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মোস্তারি বানু, ডেরেক ও’ব্রায়েন ও ডোলা সেনের দায়ের করা একাধিক আবেদনের শুনানি করছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন এলএলবি ডিগ্রিধারী আইনজীবী। প্রায় ৩২ বছর আগে, ১৯৯৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষবার আদালতে আইনজীবী হিসেবে সওয়াল করেছিলেন। সেই মামলায় তিনি ৩৩ জন অভিযুক্তের জামিন করাতে সফল হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জোগেশচন্দ্র চৌধুরী ল’ কলেজ থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি এবং রাজনীতিতে আসার আগে কিছুদিন আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন।
SIR নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশ
উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, SIR প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হতে হবে এবং সাধারণ মানুষ যেন কোনও সমস্যায় না পড়েন। “লজিক্যাল ইনকনসিস্টেন্সি”-র তালিকায় থাকা ভোটারদের নাম গ্রাম পঞ্চায়েত ও ব্লক অফিসে টাঙিয়ে রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়।
২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে তুলনা করে যেসব ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নামের গরমিল বা বয়সের অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে, সেগুলিকে এই তালিকায় রাখা হয়েছে। রাজ্যে প্রায় ১.২৫ কোটি ভোটার এই “লজিক্যাল ইনকনসিস্টেন্সি”-র আওতায় পড়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৮ জানুয়ারি এই সংক্রান্ত আবেদন দায়ের করেন এবং নির্বাচন কমিশন ও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে পক্ষভুক্ত করেন।

No comments:
Post a Comment