কীভাবে ডুবল রাম সেতু? ইতিহাস রোমাঞ্চকর, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা এখনও ধোঁয়াশায় - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Friday, February 13, 2026

কীভাবে ডুবল রাম সেতু? ইতিহাস রোমাঞ্চকর, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা এখনও ধোঁয়াশায়



প্রেসকার্ড নিউজ বিনোদন ডেস্ক, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:০০:০১ : প্রথম দেখায় এটি সমুদ্রের বুকের ওপর ভেসে থাকা বালু ও পাথরের সারি বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি শুধু ভৌগোলিক গঠন নয়—এটি বিশ্বাস, ইতিহাস আর কৌতূহলের মিলনক্ষেত্র। রামেশ্বরম থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত বিস্তৃত এই শৃঙ্খলাকেই অনেকে রাম সেতু নামে চেনেন। ছোটবেলা থেকে শোনা যায়, ভগবান রামের বানরসেনা লঙ্কায় পৌঁছতে এই সেতু নির্মাণ করেছিল। তবে প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে—যদি পাথর জলে ভাসত, তাহলে আজ এই গঠন সমুদ্রের নিচে কেন? এটি কি সত্যিই মানবনির্মিত, নাকি প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্টি? পুরাণকথা থেকে স্যাটেলাইট চিত্র—সব মিলিয়ে রাম সেতু আজও বিতর্ক, গবেষণা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু।



রহস্যে ঘেরা রাম সেতু: মানবনির্মিত না প্রাকৃতিক গঠন?

আস্থার দৃষ্টিতে রাম সেতু

বাল্মীকি রামায়ণ-এ বর্ণনা রয়েছে যে শ্রীराम সমুদ্রের ওপর সেতু নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং নল-নীল সেই কাজে নেতৃত্ব দেন। কাহিনি অনুযায়ী, এমন পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল যা জলে ভেসে থাকত। আজও রামেশ্বরম অঞ্চলে পাওয়া কিছু হালকা পাথরকে অনেকেই সেই কাহিনির সঙ্গে যুক্ত করেন।



ধর্মীয় গ্রন্থ ও লোকবিশ্বাস

রামায়ণ ছাড়াও বিভিন্ন পুরাণ ও দক্ষিণ ভারতের লোককথায় এই সেতুর উল্লেখ আছে। স্থানীয় বহু মন্দিরে একে ঐশ্বরিক নির্মাণ বলে মানা হয়। জনশ্রুতি আছে, একসময় এখানে সমুদ্রের জল অনেকটাই অগভীর ছিল এবং মানুষ নৌকা বা পায়ে হেঁটে কাছাকাছি দ্বীপে যাতায়াত করত।



ভূগোল ও স্যাটেলাইটের দৃষ্টিতে

আধুনিক সময়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে যখন স্যাটেলাইট ছবিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঝখানে অগভীর পাথর ও বালুর দীর্ঘ সারি স্পষ্ট দেখা যায়। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলকে অনেকেই Adam's Bridge নামে চিহ্নিত করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শোলস—অর্থাৎ বালুচর, চুনাপাথর ও প্রবাল স্তরের প্রাকৃতিক সমষ্টি।



বিজ্ঞানীদের মত

কিছু ভূতত্ত্ববিদের মতে, হাজার হাজার বছরে সমুদ্রস্রোত, বালু জমা ও প্রবাল গঠনের ফলে এই শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, অতীতে এটি হয়তো স্থলভাগের অংশ ছিল, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ডুবে গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত একে নিশ্চিতভাবে মানবনির্মিত প্রমাণ করার মতো সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।



“ডুবে যাওয়ার” কাহিনি

লোকবিশ্বাসে আছে, লঙ্কা বিজয়ের পর বিভীষণের অনুরোধে শ্রীরাম সেতুকে অকার্যকর করে দেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আক্রমণের পথ হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক কারণও উল্লেখযোগ্য—ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ক্ষয়। ১৯৬৪ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে তামিলনাড়ুর উপকূলীয় এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এই অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।



স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতা

আজও রামেশ্বরমে আগত তীর্থযাত্রীরা নৌকায় করে অগভীর অংশ পর্যন্ত যান, যেখানে অনেক সময় কোমরসমান জল দেখা যায়। জেলেরা জানান, কিছু জায়গায় হঠাৎ সমুদ্রের তল শক্ত ও অগভীর হয়ে ওঠে। পর্যটন গাইডরা একে “রামের সেতু” হিসেবে দেখান, আর বিজ্ঞানীরা বলেন এটি প্রাকৃতিক গঠন। সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি কেবল বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নয়—এটি আবেগ ও বিশ্বাসের অংশ।



রহস্য এখনো অমীমাংসিত

রাম সেতু নিয়ে চূড়ান্ত সত্য এখনো স্পষ্ট নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস একে ঐশ্বরিক বলে মানে, বিজ্ঞান একে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফল বলে ব্যাখ্যা করে। হয়তো ভবিষ্যতের নতুন গবেষণা ও প্রযুক্তি এই রহস্যের আরও দিক উন্মোচন করবে। ততদিন পর্যন্ত রাম সেতু বিশ্বাস, ইতিহাস ও অনুসন্ধানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবেই থেকে যাবে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad