ন্যাশনাল ডেস্ক, ২৮ এপ্রিল ২০২৬: কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলার ক্ষত এখনও তাজা। ধর্ম জিজ্ঞেস করে বেছে বেছে প্রাণে মারা হয়েছিল পর্যটকদের। সেই আতঙ্কের স্মৃতি ফিরল মহারাষ্ট্রের মুম্বাইতে। 'ধর্ম কি? কলমা পড়তে জানো?'- প্রকাশ্য রাস্তায় দুই ব্যক্তিকে প্রশ্ন। উত্তর না পেয়েই ভয়ঙ্কর কাণ্ড, দুজনকে চোখের নিমেষে ছুরির কোপ। মহারাষ্ট্রের মুম্বাইতে মিরা রোডের নয়া নগর এলাকায় রবিবার রাতে ঘটেছে এই ভয়ঙ্কর ঘটনা। জানা গিয়েছে, আক্রান্ত দুজনেই নিরাপত্তা রক্ষী। তাঁদের ওপর এই হামলার ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, ধৃতের নাম জুবায়ের আনসারি। তদন্তে উঠে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য।
রবিবার নয়া নগরে ছুরি দিয়ে দুই নিরাপত্তা কর্মীকে হামলা চালায় এক যুবক। প্রথমে তাঁদের নাম ও ধর্ম জিজ্ঞাসা করা হয় এবং তারপর কলমা পড়তে বলা হয়। উত্তর না মেলায় ওই যুবক দুই নিরাপত্তারক্ষীকে ছুরি দিয়ে হামলা করে। দুই প্রহরী নির্মাণাধীন ভবনে কর্মরত ছিলেন। ৩১ বছর বয়সী জুবায়ের আনসারি নামে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে পাকড়াও করে নয়া নগর পুলিশ।
তদন্তকারী সংস্থার সূত্র অনুযায়ী, এই ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসী যোগসূত্র রয়েছে এবং এটি একজন একক হামলাকারীর কাজ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তের কাছ থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়, যাতে আইএসআইএস, জিহাদ এবং গাজার মতো শব্দ লেখা ছিল। অভিযুক্ত ওই নিরাপত্তারক্ষীদের তাঁদের ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল এবং তাঁরা কলমা পাঠ করতে পারে কি না, তাও জানতে চেয়েছিল।
রবিবার ভোর ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। রাজকুমার মিশ্র এবং সুব্রত সেন একটি নির্মাণাধীন ভবনে কর্মরত ছিলেন। এ সময় অভিযুক্ত জুবায়ের আনসারি এসে সেখানে উপস্থিত নিরাপত্তারক্ষীকে তাঁর নাম ও ধর্ম সম্পর্কে জানতে চায়। তারপর কলমা পড়তে বলে। নিরাপত্তারক্ষীরা কলমা পড়তে না পারলে সঙ্গে সঙ্গে ছুরি বের করে তাদের ওপর হামলা চালায় অভিযুক্ত। দুই প্রহরীই এই হামলায় আহত হয়। তাদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। হামলার পর অভিযুক্ত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। আক্রান্ত দুজনের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ইন্ডিয়া টিভি হিন্দি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, অভিযুক্তের কাছ থেকে পাওয়া চিরকুটে হুমকিমূলক বাক্য এবং উগ্রপন্থী চিন্তার ইঙ্গিত রয়েছে, যা তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সন্দেহ আরও গভীর করেছে। চিরকুটটিতে লেখা আছে- “একাকী নেকড়েরা তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তোমরা মুশরিকরা এখন থেকে বিলাদ হিন্দে আসল জিহাদ দেখবে!” এ ছাড়াও কিছু অসংলগ্ন কথাও লেখা ছিল, যেমন “মানুষ, পরিবার, স্ত্রী, বাবা-মা… তোমাকে ছেড়ে যাবে। আল্লাহ তাদের পথ দেখান। গাজা কেবল তখনই মুক্ত হবে…।” প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহজনক পরিস্থিতি সামনে আসার পর মামলাটি এটিএস-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযুক্তের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, মোবাইল ডেটা, ব্রাউজিং হিস্ট্রি এবং যোগাযোগের রেকর্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের কথানুযায়ী, অভিযুক্ত প্রথমে ঘটনাস্থলে এসে মসজিদের ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে তাঁদের ধর্ম সম্পর্কে জানতে চায় এবং অভিযোগ অনুযায়ী তাকে কলমা পড়তে বলে। নিরাপত্তারক্ষী যখনই না বলেন, অভিযুক্ত হঠাৎ তাঁকে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে। এরপর নিরাপত্তা কক্ষে প্রবেশ করে, সেখানে উপস্থিত অন্য প্রহরীকেও একইভাবে আক্রমণ করে।
অভিযুক্তর বাড়িতে তল্লাশির সময় এমন কিছু নোট ও নথি পাওয়া গেছে যাতে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসআইএস-এর সঙ্গে যুক্ত আদর্শের চিহ্ন পাওয়া গেছে। কিছু নোটে 'লোন উলফ', 'জিহাদ' এবং 'গাজা'-এর মতো শব্দ লেখা পাওয়া গেছে।
জুবায়ের আনসারি একজন বিজ্ঞান স্নাতক এবং বহু বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করছিল। ভারতে ফিরে আসার পর, মীরা রোডে একাই থাকত এবং অনলাইনে রসায়ন শেখানোর কাজ করছিল। বলা হচ্ছে চাকরি না পাওয়ায় যুবক ধীরে ধীরে অনলাইন র্যাডিক্যাল বিষয়বস্তুর দিকে ঝুঁকেছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির সন্দেহ, অভিযুক্তরা সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে এসেছিল যা উগ্র মতাদর্শ প্রচার করে।
অভিযুক্ত কি একাই এই হামলা করেছে নাকি এর পেছনে বড় নেটওয়ার্ক আছে? এর পাশাপাশি হামলাটি আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছে নাকি আকস্মিক ঘটনার ফল, তাও তদন্ত করা হচ্ছে। মীরা রোডের এই ঘটনাটি শুধু অপরাধ নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মৌলবাদ কীভাবে সমাজে প্রবেশ করছে তারও একটি গুরুতর ইঙ্গিত। এখন পুরো বিষয়টি এটিএস-এর হাতে এবং আগামী দিনে এই ক্ষেত্রে আরও বড় কিছু প্রকাশ্যে আসতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

No comments:
Post a Comment