ন্যাশনাল ডেস্ক, ২৭ মে ২০২৬: সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রেখেছে। আদালত বলেছে যে, এই প্রক্রিয়াটি সংবিধান ও আইনসম্মত। সহজ কথায়, আদালত মনে করে যে এসআইআর পরিচালনা করা নির্বাচন কমিশনের অধিকার এবং এটি নির্ভুল ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি একটি বৈধ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। আদালত বলেছে যে, নির্বাচন কমিশন আইন মেনেই এসআইআর পরিচালনা করেছে এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনও ত্রুটি ছিল না। নির্বাচন কমিশন তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেনি।
বিহারে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে চ্যালেঞ্জ করে করা আবেদনের শুনানি চলাকালে বুধবার শীর্ষ আদালত এই রায় দেয়। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীকে নিয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই মামলার রায় প্রদান করে। এসআইআর বৈধ, জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। এটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সাংবিধানিক আবশ্যকতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। সংবিধানে ৩২৪ ধারা অনুযায়ী এসআইআর করার ক্ষমতা কমিশনের আছে', শুনানিতে জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। কমিশন তার বিধিবদ্ধ ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করে কোনও পদক্ষেপ করেছে এমন বলার অবকাশ নেই, জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট।
সুপ্রিম কোর্টের মতে, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে যে, মামলাটির বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর এটা স্পষ্ট যে এসআইআর-এর উদ্দেশ্য বৈধ এবং সাংবিধানিকভাবে ন্যায্য। শীর্ষ আদালতের মতে, এই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, সম্পূর্ণতা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
সুপ্রিম কোর্ট বলেছে যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম যোগ করা বা বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার অধীন। আদালতের মতে, যদি উপলব্ধ নথিপত্রের ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে, এর অর্থ এই নয় যে ওই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিকত্ব হারাবেন। আদালত স্পষ্ট করেছে যে, এই বিষয়টি শুধুমাত্র ভোট দেওয়ার অধিকার সম্পর্কিত, নাগরিকত্ব নির্ধারণ সম্পর্কিত নয়।
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে যে, এই ধরণের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ওই ব্যক্তিকে উপযুক্ত ট্রাইব্যুনালে পাঠাতে পারে। এছাড়াও, যেকোনও কারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়াকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হবে না বরং তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
শুনানির সময় আদালত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে। আদালত বলেছে যে, ভোটার তালিকা সংশোধন করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের অবশ্যই আছে, কিন্তু এই ক্ষমতা "সীমাহীন" হতে পারে না। এই প্রক্রিয়াটি অবশ্যই স্বচ্ছতা এবং স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি অনুসারে পরিচালিত হতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নির্বাচন কমিশন চার সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মামলাগুলো পাঠাবে। আদালত বলেছে যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ধরণের ক্ষেত্রে নোটিশ জারি করবে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বক্তব্য পেশ করার পূর্ণ সুযোগ দেবে এবং বিধানসভা বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই দাবিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
সুপ্রিম কোর্ট আরও স্পষ্ট করেছে যে, যদি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যক্তিকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তবে ভোটার তালিকায় তার নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হবে।
গত বছর এসআইআর-কে চ্যালেঞ্জ করে বেশ কয়েকটি আবেদন দাখিল করা হয়েছিল। এর মধ্যে বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এডিআর) এবং পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (পিইউসিএল) ও রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদবের আবেদনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়াও, সাংসদ মহুয়া মৈত্র, মনোজ ঝা, কে.সি. ভেনুগোপাল, সুপ্রিয়া সুলে এবং মুজাহিদ আলমও আবেদন দাখিল করেন।
ন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান উইমেন সহ আরও বেশ কয়েকটি সংস্থা ও ব্যক্তি এই বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। আবেদনকারীদের মতে, এসআইআর প্রক্রিয়াটি বিদ্যমান ভোটারদের উপর তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের ভার চাপিয়ে দিয়েছে, যা তাদের ভাষায় একটি "স্থগিত নাগরিকত্ব" ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
এই সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে সংশোধিত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে ইতোমধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়াটি প্রথম বিহারে ২০২৫ সালের জুন মাসে প্রয়োগ করা হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে, মৃত ভোটারদের নাম সহ ৬০ লক্ষেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে, নির্বাচনের ঠিক আগে তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এসআইআর-এর অধীনে, ২০০২ বা ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না, সেই ভোটারদের পুরোনো ভোটার তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সাথে তাদের সংযোগ প্রমাণ করার জন্য নথিপত্র জমা দিতে হতো। প্রাথমিকভাবে, নির্বাচন কমিশন ১১টি বৈধ নথি চিহ্নিত করেছিল, কিন্তু আধার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পরে, শুনানির সময়, সুপ্রিম কোর্ট গ্রহণযোগ্য নথির তালিকায় আধার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করে।

No comments:
Post a Comment