নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া: কৃষিজমি সংলগ্ন এলাকা থেকে বেআইনিভাবে মাটি কাটার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে সরব হচ্ছিল স্থানীয়রাই। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে একটি জেসিবি মেশিন এবং তিনটি ট্রাক্টর উদ্ধার করল পুলিশ। অভিযানের খবর পেয়ে শ্রমিক ও চালকেরা আগেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ। উদ্ধার হওয়া যন্ত্রপাতি থানায় নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনা নদিয়ার নবদ্বীপ ব্লকের ফরেস্টডাঙা এলাকার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই ফরেস্টডাঙা এলাকায় চাষের জমির পাশ থেকে বালি ও মাটি কেটে ট্রাক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। শুক্রবার স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে মাটি কাটার কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা পালিয়ে যায় বলে দাবী এলাকাবাসীর।
স্থানীয় কৃষক রমেশ মাহাতো অভিযোগ করেন, প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিন সকাল ছয়-সাতটা থেকে বিকেল পর্যন্ত আট থেকে দশটি ট্রাক্টরে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবী, এর ফলে গ্রামের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কৃষিজমির পাড় ভেঙে যাচ্ছে এবং জমিতে জল জমে ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে। অবিলম্বে এই কাজ বন্ধ করার দাবী জানিয়েছেন তিনি।
একই অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষক শিবশঙ্কর দেবনাথ। তাঁর কথায়, যেভাবে কৃষিজমির মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাতে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ভারী ট্রাক্টর চলাচলের কারণে গ্রামের রাস্তার অবস্থাও ক্রমশ বেহাল হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, মাটি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দেওয়া প্রদীপ ঘোষ ও প্রতাপ ঘোষ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবী, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের অনুমতি এবং সরকারি রয়্যালটি প্রদান করেই মাটি কাটা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট জমিটি রানাঘাটের এক বাসিন্দার মালিকানাধীন এবং স্থানীয় আবদার বিশ্বাস সেই জমির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর কাছ থেকেই বৈধভাবে মাটি কেনা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবী, ২৩ জুন সরকারি রয়্যালটি জমা দেওয়ার পর ২৫ জুন থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত চার দিনের জন্য বিএলআরও দপ্তর থেকে তাঁদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, অতীতে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ একাংশ এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং তখন তাঁদের কাজ করতে দেওয়া হয়নি। বর্তমানে সমস্ত সরকারি নিয়ম মেনেই কাজ করা হলেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে কাজে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে দাবী তাঁদের।
তবে স্থানীয়দের একাংশ একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, যদি সমস্ত কাজ সরকারি অনুমতি নিয়েই হয়ে থাকে, তাহলে প্রায় এক মাস ধরে মাটি কাটার অভিযোগ উঠছে কেন? পুলিশ পৌঁছতেই শ্রমিক ও চালকেরা কেন এলাকা ছেড়ে পালালেন? উদ্ধার হওয়া জেসিবি ও ট্রাক্টর পাশের পাটক্ষেতে কেন রাখা হয়েছিল? যদিও এই প্রশ্নগুলির সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্ধার হওয়া একটি জেসিবি ও তিনটি ট্রাক্টর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র, রয়্যালটির নথি এবং অন্যান্য কাগজপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফরেস্টডাঙার একাধিক বাসিন্দা দাবী করেছেন, ভোর থেকেই এলাকায় ট্রাক্টরের দাপাদাপি শুরু হয় এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত তা চলে। ভারী যান চলাচলের ফলে গ্রামের রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হলেও পরে সেই রাস্তা সংস্কারের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয় না। তাঁদের অভিযোগ, আগে এক পক্ষ এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখন অন্য পক্ষ যুক্ত হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সমস্যার কোনও পরিবর্তন হয়নি। ভয় ও হুমকির আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না বলেও দাবী স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রের আরও দাবি, বর্তমানে যাঁরা এই মাটি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বিজেপি-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। অভিযোগ, শুক্রবার ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক স্থানীয় বুথ সভাপতিকেও ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সমগ্র ঘটনায় উদ্ধার হওয়া যন্ত্রপাতির নথিপত্র, অনুমতির বৈধতা এবং বাস্তবে কতদিন ধরে মাটি কাটার কাজ চলছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন ফরেস্টডাঙার বাসিন্দারা।

No comments:
Post a Comment