দুর্গাপুজো এখনও বেশ কিছুটা দূরে। কিন্তু তার আগেই বাংলার পুজোকে ঘিরে শুরু হয়েছে একাধিক বিতর্ক। বিশেষ করে থিমের নামে প্রতিমার উপস্থাপনা, মণ্ডপের পরিবেশ এবং আমিষ খাবার নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। এরই মধ্যে আসানসোলের বার্ণপুরে দুর্গাপুজোর খুঁটিপুজোর অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।
রবিবার বার্ণপুরের একটি দুর্গাপুজো কমিটির খুঁটিপুজোর অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। অনুষ্ঠানে ঢাক বাজিয়ে পুজোর সূচনা পর্বে অংশ নেন মন্ত্রী। তাঁকে ঘিরে পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যেও উৎসাহ দেখা যায়। তবে উৎসবের আবহের পাশাপাশি দুর্গাপুজোর আয়োজন নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দেন তিনি।
অগ্নিমিত্রার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—থিম পুজোর নামে যেন দেবী দুর্গার চিরাচরিত রূপ ও পুজোর মর্যাদা নষ্ট না হয়। শিল্প ও সৃজনশীলতার বিরোধিতা না করেও তিনি মনে করিয়ে দেন, থিম তৈরি করতে গিয়ে এমন কোনও উপকরণ বা উপস্থাপনা বেছে নেওয়া উচিত নয়, যা মাতৃপ্রতিমার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় আবেগে আঘাত করতে পারে।
বিশেষ করে জুতো বা চটি জাতীয় উপকরণ দিয়ে থিম তৈরি করা কিংবা প্রতিমার মুখ ও সাজসজ্জায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনার বিষয়ে আপত্তি জানান তিনি। তাঁর মতে, নতুনত্ব থাকলেও দুর্গাপুজোর নিজস্ব ঐতিহ্য, শালীনতা এবং ধর্মীয় আবহকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আমিষ খাবার নিয়ে কী বললেন মন্ত্রী?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে দুর্গাপুজোর মণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাবার নিয়ে। সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদও বাংলার দুর্গাপুজো কমিটিগুলির উদ্দেশে একাধিক নির্দেশিকা বা আবেদন জানিয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুজোর মণ্ডপ ও প্রতিমার পবিত্রতা বজায় রাখতে মণ্ডপের ভিতরে এবং সংলগ্ন এলাকায় আমিষ খাবার বিক্রি বা খাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে চলা উচিত।
তবে VHP-এর বক্তব্যকে গোটা বাংলায় আমিষ খাবার নিষিদ্ধ করার দাবি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। সংগঠনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, বাংলার দুর্গাপুজো ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ নিরামিষ উৎসব নয়। আমিষ খাবার বিক্রি হলে তা পুজোর স্থান থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখার কথা বলা হয়েছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই অগ্নিমিত্রা পালও তাঁর অবস্থান জানান। তিনি স্পষ্ট করেন, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে সরকার কোনও সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা চাপাচ্ছে না। অর্থাৎ কে আমিষ খাবেন বা নিরামিষ খাবেন, সেটি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়।
তবে তাঁর আবেদন, দুর্গাপুজোর মণ্ডপের ভিতরের পরিবেশের পবিত্রতা বজায় রাখা হোক এবং সেখানে কেউ যেন আমিষ খাবার নিয়ে প্রবেশ না করেন। মণ্ডপের বাইরে খাবার নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই বলেও তিনি জানান।
ফলে বিষয়টি নিয়ে যে ধারণা তৈরি হয়েছে—দুর্গাপুজোর সময় গোটা বাংলায় আমিষ খাবার বন্ধ হয়ে যাবে—তা সঠিক নয়। বর্তমানে যে বক্তব্যগুলি সামনে এসেছে, সেগুলি মূলত পুজোর মণ্ডপ ও তার আশপাশের ধর্মীয় পরিবেশকে কেন্দ্র করে।
VHP-এর নির্দেশিকা ঘিরে কেন বিতর্ক?
দুর্গাপুজোর আগে VHP-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। সংগঠনটি পুজোর ঐতিহ্য বজায় রাখার উপর জোর দিয়েছে। প্রতিমার পবিত্রতা, মণ্ডপের পরিচ্ছন্নতা, থিমের ক্ষেত্রে দেবীর প্রচলিত রূপের প্রতি সম্মান এবং খাবারের ব্যবস্থাপনা—একাধিক বিষয় নিয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করা হয়েছে।
VHP-এর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, থিম পুজোর বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নয়। তাদের আপত্তি এমন থিমের ক্ষেত্রে, যেখানে তাদের মতে দেবী দুর্গার প্রচলিত রূপ বিকৃত হতে পারে বা ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগতে পারে। জুতো বা ডিমের মতো উপকরণকে কেন্দ্র করে থিম তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এমন অবস্থায় অগ্নিমিত্রার বক্তব্যকে সেই বৃহত্তর বিতর্কের মধ্যেই দেখা হচ্ছে। তবে তাঁর বক্তব্য কোনও নতুন সরকারি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা নয়; বরং পুজোর পরিবেশ ও মণ্ডপের পবিত্রতা বজায় রাখার আবেদন হিসেবেই সামনে এসেছে।
অনুদান নিয়েও মন্তব্য
দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে দেওয়া সরকারি অনুদান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে বার্ণপুরের অনুষ্ঠানে। এ বিষয়ে অগ্নিমিত্রা জানান, সরকারি অনুদানের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের পক্ষ থেকেই নেওয়া হবে এবং সরকারের নির্দেশই অনুসরণ করা হবে। পুজো উদ্যোক্তারাও সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুজোর পাশাপাশি নাগরিক পরিষেবায় জোর
বার্ণপুরের অনুষ্ঠানে শুধু দুর্গাপুজো নিয়েই কথা বলেননি মন্ত্রী। আসানসোল শহরের নাগরিক পরিষেবা নিয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
রাস্তার সমস্যা, নিকাশি ব্যবস্থা এবং পানীয় জলের মতো মৌলিক পরিষেবাগুলির উন্নতির উপর জোর দেওয়ার কথা জানান অগ্নিমিত্রা। উৎসবের প্রস্তুতির পাশাপাশি শহরকে আরও সুন্দর ও নাগরিকবান্ধব করে তোলার বিষয়েও কাজ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোর আগে বাংলায় এবার থিম, প্রতিমার উপস্থাপনা, মণ্ডপের পরিবেশ এবং খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে। একদিকে সৃজনশীলতার মাধ্যমে নতুনত্ব আনার চেষ্টা, অন্যদিকে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পুজোর পরিবেশের মর্যাদা বজায় রাখার দাবি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হয়, সেটাই এখন নজরে।

No comments:
Post a Comment