ক্যামাক স্ট্রিট-কাণ্ডে অভিষেকের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়কেও তলব, বাড়িতে গিয়ে নোটিস পুলিশের - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Monday, August 31, 2026

ক্যামাক স্ট্রিট-কাণ্ডে অভিষেকের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়কেও তলব, বাড়িতে গিয়ে নোটিস পুলিশের


 বিলবোর্ড সরানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের তদন্তে এবার নজরে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ সহকারী। বুধবার শেক্সপিয়র সরণি থানায় হাজিরার নির্দেশ

ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরে পুরকর্মী ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। এবার তদন্তের আওতায় এলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়।

রবিবার সন্ধ্যায় নিউ আলিপুরের বাড়িতে গিয়ে সুমিত রায়ের হাতে নোটিস দেওয়ার চেষ্টা করে শেক্সপিয়র সরণি থানার পুলিশ। তাঁকে আগামী বুধবার থানায় হাজির হয়ে তদন্তকারীদের মুখোমুখি হতে বলা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, ২৭ আগস্ট ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় সুমিত রায়ের কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হতে পারে।

কী ঘটেছিল ক্যামাক স্ট্রিটে?

ঘটনার সূত্রপাত ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার। কলকাতা পুরসভার আধিকারিক ও কর্মীরা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরে লাগানো একটি বিলবোর্ড/হোর্ডিং সরাতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

পুরসভার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তৃণমূলের নাম ও প্রতীকযুক্ত ওই হোর্ডিংটি অনুমোদনহীনভাবে লাগানো হয়েছিল এবং সেটির কাঠামোও বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল। সেই কারণেই সেটি সরাতে পুরকর্মীরা পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে সেখানে পৌঁছন।

কিন্তু হোর্ডিং সরানোকে কেন্দ্র করে দফতরের সামনে বাধা তৈরি হয়। পুলিশ ও পুরকর্মীরা ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলে তৃণমূল কর্মী ও অভিষেকের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ ও সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা দেওয়া, মারধর এবং এক মহিলা আধিকারিককে হেনস্থার চেষ্টার মতো অভিযোগও সামনে আসে।

অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ ছিল, কোনও যথাযথ লিখিত নোটিস বা বৈধ সরকারি নির্দেশের কপি না দেখিয়েই পুলিশ ও পুরকর্মীরা তাঁর দফতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। ঘটনাস্থলে তিনি পুলিশ আধিকারিকদের কাছে অভিযানের আইনি ভিত্তি জানতে চান। তৃণমূলের পক্ষ থেকেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

তিনটি FIR, একাধিক ধারা

ঘটনার পর শেক্সপিয়র সরণি থানায় মোট তিনটি FIR দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের পাশাপাশি তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দলের নেতাদের মধ্যে বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও হুমায়ুন কবীরের নামও রয়েছে।

পুলিশের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বেআইনি জমায়েত, দাঙ্গা, সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা, মারধর, ভয় দেখানো এবং সরকারি আধিকারিককে তাঁর দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার মতো বিষয়।

প্রথম দফায় ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরবর্তী আপডেটে গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জন হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ১৩ জনকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর খবরও প্রকাশ্যে এসেছে।

অভিষেক ও ডেরেককেও তলব

তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ ইতিমধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েনকে নোটিস দিয়েছে। ডেরেককে ৩১ আগস্ট এবং অভিষেককে ১ সেপ্টেম্বর শেক্সপিয়র সরণি থানায় হাজির হতে বলা হয়েছে।

এরপর রবিবার সুমিত রায়কেও নোটিস দেওয়া হল। অর্থাৎ তদন্তের পরিধি এখন অভিষেকের দফতরের সঙ্গে যুক্ত আরও ব্যক্তিদের দিকেও বিস্তৃত হচ্ছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ সুমিত রায়ের ভূমিকা?

সুমিত রায় দীর্ঘদিন ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহকারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলায় তদন্ত হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়েও তাঁকে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

আগস্ট মাসেই পশ্চিমবঙ্গ CID তাঁকে পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি জমি সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় একাধিক দিন জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ৮ আগস্ট তাঁকে প্রায় ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরের দিনও প্রায় আট ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ চলে।

একটি পৃথক নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলাতেও CID তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ১১ আগস্ট পর্যন্ত চার দিনে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া একাধিক FIR নিয়েও কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়েছে। ২৫ আগস্ট আদালত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIRগুলির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

জমি মামলাতেও তদন্তের মুখে সুমিত

পশ্চিম মেদিনীপুরের জমি সংক্রান্ত মামলায় সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। CID-এর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি অভিযোগগুলিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিলেন। অন্যদিকে তদন্তকারীরা জানিয়েছিলেন, অভিযোগের নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় তাঁর নাম সামনে আসায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ক্যামাক স্ট্রিট অফিস নিয়েও আলাদা আইনি বিতর্ক

শুধু বিলবোর্ড সরানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ নয়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের দফতর নিয়েও আলাদা আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ভবনটির মালিকপক্ষের অভিযোগ, যুব তৃণমূল কংগ্রেস ২০২০ সালে নির্দিষ্ট অংশ ভাড়া নিলেও পরে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে আরও অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়াই হোর্ডিং ও লোহার কাঠামো তৈরির অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ফলে একটি বিলবোর্ড সরানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন একাধিক স্তরে আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

বুধবারের জিজ্ঞাসাবাদে কী জানতে চাইবে পুলিশ?

তদন্তকারীদের মূল নজর থাকবে ২৭ আগস্টের ঘটনার সময় সুমিত রায় কোথায় ছিলেন, দফতরের ভিতরে বা বাইরে তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল কি না এবং সংঘর্ষের আগে বা পরে তিনি কোনও নির্দেশ বা সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না—এই ধরনের প্রশ্নের দিকে।

তবে সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনও তথ্য এখনও সামনে আসেনি। তাঁকে তলব করা হয়েছে তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর বক্তব্য জানার জন্য।

এখন নজর বুধবারের জিজ্ঞাসাবাদের দিকে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরের ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সুমিত রায়ের কাছ থেকে পুলিশ কী তথ্য পায় এবং তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী কোনও পদক্ষেপ করা হয় কি না, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad