অভিষেকের অফিসের বিলবোর্ড খুলতে গিয়ে ধস্তাধস্তি, একাধিক FIR, গ্রেফতার ১৪; এবার একে একে তলব তৃণমূলের নেতাদের
কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসের উপরে থাকা বিলবোর্ড খোলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনার ঘটনায় কলকাতা পুলিশের তদন্ত আরও জোরদার হয়েছে। ইতিমধ্যেই একাধিক FIR দায়ের এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর এবার তৃণমূল নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও প্রাক্তন বিধায়ক তথা প্রাক্তন IPS আধিকারিক হুমায়ুন কবীরকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ৯ ক্যামাক স্ট্রিটের ওই ভবনে থাকা বিলবোর্ডটি প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই লাগানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেটি সরাতে ২৭ অগস্ট কলকাতা পুরসভা ও কলকাতা পুলিশের আধিকারিকরা সেখানে পৌঁছন। বিলবোর্ড খোলার সময়ই তৃণমূল নেতা-কর্মী, নিরাপত্তারক্ষী এবং পুলিশ-পুরকর্মীদের মধ্যে বচসা ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
কী ঘটেছিল ক্যামাক স্ট্রিটে?
পুলিশের দাবি, বিলবোর্ড সরানোর কাজে বাধা দেওয়া হয় এবং সরকারি কর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়। এক পুলিশকর্মীর ওয়্যারলেস সেট ছিনিয়ে নেওয়া এবং সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি এক মহিলা আধিকারিককে হেনস্থার অভিযোগ করেছে পুলিশ।
অন্যদিকে, তৃণমূলের তরফে গোটা অভিযানের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দলের নেতাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় নথি ও প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা ছিল এবং ঘটনাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনটি FIR, একাধিক তৃণমূল নেতা নামেই
ঘটনার পর কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে তিনটি FIR দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও'ব্রায়েন, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় এবং হুমায়ুন কবীর-সহ কয়েকজনের নাম রয়েছে। অভিযোগগুলির মধ্যে বেআইনি জমায়েত, সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা, মারধর, দাঙ্গা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মতো বিভিন্ন ধারা রয়েছে।
ঘটনার পর প্রথম দফায় ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে একাধিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী আপডেটে গ্রেফতারের সংখ্যা ১৪-তে পৌঁছেছে বলে জানা যায়।
একে একে তলব অভিষেক-ডেরেকদের
তদন্তের অংশ হিসেবে কলকাতা পুলিশ ইতিমধ্যেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও'ব্রায়েনকে শেক্সপিয়র সরণি থানায় হাজির হওয়ার নোটিস দিয়েছে।
অভিষেককে ১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় হাজির হতে বলা হয়েছিল। তাঁর কালীঘাটের বাড়িতে গিয়ে পুলিশ নোটিস দেয়। ডেরেক ও'ব্রায়েনকেও হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি নির্ধারিত সময়ে থানায় হাজির হননি। তাঁর আইনজীবী ই-মেলের মাধ্যমে আরও সময় চেয়েছেন বলে জানা যায়। এরপর পুলিশ তাঁর বাড়িতে গিয়ে দ্বিতীয় নোটিস দেয়।
এবার বৈশ্বানর ও হুমায়ুন কবীর
তদন্ত এগোতে থাকায় এবার বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও হুমায়ুন কবীরের নামও তলবের তালিকায় এসেছে। পুলিশ ঘটনার সময়কার ভিডিও ফুটেজ, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
বৈশ্বানর বাড়িতে না থাকায় তাঁর স্ত্রী তথা প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর চৈতালি চট্টোপাধ্যায়ের হাতে পুলিশ নোটিস দিয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে ফের পুলিশ ও দমকল
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনাকে ঘিরে শুধু ফৌজদারি তদন্তই নয়, ভবনের নিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়েও প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
৩১ অগস্ট কলকাতা পুলিশ ও দমকল বিভাগের আধিকারিকরা অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে গিয়ে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অনুমোদিত নকশা খতিয়ে দেখেন। দমকলের তরফে এটিকে নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন বলা হলেও রাজনৈতিক মহলে তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনা এখন শুধু পুলিশের তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই; তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতেও তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
তৃণমূলের তরফে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দলের নেতাদের বক্তব্য, বিলবোর্ড সরানোর অভিযানকে কেন্দ্র করে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য—সরকারি কর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের তদন্ত আইন মেনেই করা হচ্ছে। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ-সহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ক্যামাক স্ট্রিট-কাণ্ডে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। এখন নজর থাকবে তলব করা নেতারা কবে থানায় হাজির হন এবং জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্ত কোন দিকে এগোয়।

No comments:
Post a Comment