চোখের দীর্ঘদিনের চিকিৎসা করাতে ফের আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর সেপ্টেম্বরের শুরুতেই বিদেশে গিয়েছেন তিনি। জানা গিয়েছে, চিকিৎসার জন্য তাঁর গন্তব্য আমেরিকা এবং সফরের মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহ।
তবে এই বিদেশযাত্রার আগে তাঁকে পেরোতে হয়েছে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। বিদেশে গিয়ে চিকিৎসার অনুমতি চেয়ে প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অভিষেক। কিন্তু সেই অনুমতি মেলেনি। পরে বিষয়টি গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। ১০ অগস্ট ২০২৬-এ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ তাঁকে তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসার অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে বেশ কিছু শর্তও বেঁধে দেয় শীর্ষ আদালত।
কী বলেছিল হাইকোর্ট?
অভিষেকের বিদেশে চিকিৎসার আবেদন নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের একক বেঞ্চে শুনানি হয়েছিল। আদালত প্রথমে তাঁকে রাজ্যের সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলে। সেই চিকিৎসকদের রিপোর্টের ভিত্তিতেই বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বিচার করা হবে বলে আদালত জানিয়েছিল।
৫ অগস্টের শুনানিতে হাইকোর্ট বিদেশযাত্রার অনুমতি দেয়নি। আদালতের বক্তব্য ছিল, অভিষেক যদি চিকিৎসক-নির্ধারিত মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে হাজির হন এবং বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চিকিৎসকদের মতামত পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা সম্ভব।
এরপরই হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যান অভিষেক।
শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে মিলল অনুমতি
১০ অগস্টের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানায়, চলমান তদন্তে গুরুতর কোনও বাধা সৃষ্টি হবে না বলে মনে করছে আদালত। তাই চোখের অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসার জন্য তিন সপ্তাহ বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে অনুমতিটি নিঃশর্ত ছিল না।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, অভিষেককে জানাতে হয়েছে তাঁর বিদেশ সফরের সূচি, কোথায় থাকবেন, কোন চিকিৎসক বা হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন, কবে দেশে ফিরবেন এবং তাঁর যাতায়াতের ফ্লাইট সংক্রান্ত তথ্য। এসব তথ্য তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দেয়, তাঁর ব্যক্তিগত সফরসূচি বা অবস্থানের তথ্য যেন প্রকাশ্যে আনা না হয়।
আদালতের নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে তাঁকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে এবং তাঁর কাছে অন্য কোনও পাসপোর্ট নেই—এই মর্মে হলফনামা দিতে হবে।
কেন বারবার বিদেশে চিকিৎসা?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখের সমস্যার সূত্রপাত প্রায় এক দশক আগে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে সিঙ্গুরের কাছে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে তাঁর গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। দুর্ঘটনায় তাঁর চোখের আশপাশে গুরুতর আঘাত লাগে এবং পরবর্তী সময়ে একাধিকবার অস্ত্রোপচার করতে হয়।
দুর্ঘটনার পর কলকাতাতেই তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার হয়েছিল। ২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবর তাঁর বাঁ চোখের অরবিটাল ফ্লোরের ফ্র্যাকচার মেরামতের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকদের একটি বড় দল সেই অস্ত্রোপচারে যুক্ত ছিল।
পরবর্তীকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি। ২০২২ সালে আমেরিকার জনস হপকিন্স হাসপাতালে তাঁর চোখের অস্ত্রোপচারের খবর প্রকাশ্যে আসে।
২০২৪ সালে অষ্টম অস্ত্রোপচার
চোখের সমস্যা নিয়ে অভিষেকের দীর্ঘ চিকিৎসা-ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির একটি ছিল ২০২৪ সালের অস্ত্রোপচার। ওই সময় তিনি নিজেই সমাজমাধ্যমে জানান, ২০১৬ সালের দুর্ঘটনার পর চোখ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং সেটি ছিল তাঁর অষ্টম অস্ত্রোপচার।
অস্ত্রোপচারের পর তিনি জানান, চিকিৎসা সফল হয়েছে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য তাঁকে চিকিৎসকদের দেওয়া কিছু নিয়ম ও সতর্কতা মেনে চলতে হবে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে চোখের চিকিৎসার কারণে তাঁকে রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেও মাঝেমধ্যে বিরতি নিতে হয়েছে। ২০২৪ সালেও চিকিৎসাজনিত কারণে সংগঠনের কাজ থেকে সাময়িক বিরতির কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
আমেরিকায় চিকিৎসা, আর কলকাতায় অন্য উত্তেজনা
অভিষেক যখন চিকিৎসার জন্য আমেরিকার উদ্দেশে রওনা দেন, ঠিক সেই সময় কলকাতায় তাঁর ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ওই দফতরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। সংবাদসূত্র অনুযায়ী, কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তি দফতরে ঢুকে কম্পিউটার, সিসিটিভি মনিটর এবং অন্যান্য সামগ্রী নষ্ট করে বলে অভিযোগ। ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটির তদন্ত চলছে।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন অর্থাৎ ৪ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ দমকল বিভাগের তরফে ক্যামাক স্ট্রিটের ওই ভবনের কয়েকটি অংশ খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দমকলের নজরে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস
দমকল বিভাগের পরিদর্শনে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক গুরুতর ঘাটতির কথা উঠে এসেছে বলে সরকারি আধিকারিকদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বিশেষ করে ভবনের বেসমেন্ট এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম তলা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম তলাতেই অভিষেকের দলীয় দফতর রয়েছে। দমকল বিভাগের অভিযোগ, অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যথাযথ ছিল না এবং সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেটের মেয়াদও শেষ হয়ে গিয়েছিল।
বাংলা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিদর্শনে বেসমেন্টে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ঘাটতি, সপ্তম তলায় জরুরি নির্গমন ব্যবস্থার সমস্যা এবং ফায়ার অ্যালার্ম কাজ না করার মতো বিষয় সামনে আসে। ভবনের মালিককে আগে নোটিস দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব না মেলায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, অভিষেক বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার সময়েই তাঁর কলকাতার দফতরকে ঘিরে একসঙ্গে দু’টি বড় ঘটনা সামনে এসেছে—একদিকে ভাঙচুরের অভিযোগ, অন্যদিকে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে দমকলের কড়া পদক্ষেপ।
এখন কী?
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী অভিষেকের বিদেশে থাকার সময়সীমা তিন সপ্তাহের বেশি হওয়ার কথা নয়। চিকিৎসা শেষে তাঁকে দেশে ফিরতে হবে। আদালত তাঁর সফরের বিস্তারিত তথ্য তদন্তকারী সংস্থাকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেও সেই তথ্য প্রকাশ্যে না আনার কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ফলে এখন নজর দু’দিকে—একদিকে আমেরিকায় তাঁর চোখের চিকিৎসার ফলাফল এবং দেশে ফেরার সময়সূচি, অন্যদিকে কলকাতায় ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরকে ঘিরে চলতে থাকা আইনি ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি।
দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যার চিকিৎসা চালিয়ে আসা অভিষেকের জন্য এই সফর তাই শুধুমাত্র একটি বিদেশযাত্রা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আদালতের নির্দেশ, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা এবং দেশে চলতে থাকা একাধিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কও।

No comments:
Post a Comment