সরকার পরিবর্তনের পর রাজ্যের রাজস্ব আদায়ে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, তিন মাসের হিসাবেও তার প্রতিফলন মিলেছে। সরকারের দাবি, ক্ষমতায় আসার পর প্রথম তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব রাজস্ব আদায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে।
সরকারের কাছে এই বৃদ্ধি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থার উপর দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে বড় ঋণের চাপ। ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের পাশাপাশি সরকারি কর্মীদের বেতন-পেনশন, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, ভর্তুকি এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে সরকারের নিজস্ব আয় বাড়ানো এখন অন্যতম বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ।
নবান্নের বক্তব্য, এই রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষের উপর নতুন করে বড় কোনও করের বোঝা চাপানো হয়নি। বরং কর আদায়ের ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও কার্যকর করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোথায় কর ফাঁকি হচ্ছে, কোথায় সরকারি প্রাপ্য রাজস্ব আদায় হচ্ছে না এবং কোথায় ‘রেভিনিউ লিকেজ’ রয়েছে—সেগুলির দিকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি খনি ও খাদান-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে সরকারের যে রাজস্ব পাওয়ার কথা, তা নিশ্চিত করার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, নিয়মিত করদাতাদের উপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে করের আওতা বৃদ্ধি এবং আদায়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নজরদারি বাড়ানো গেলে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব।
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসেই আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায়ের যে তথ্য সামনে এসেছিল, পরবর্তী তিন মাসের পরিসংখ্যান সেই প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে। অর্থ দফতরের কাছে এটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নেওয়া পদক্ষেপগুলির প্রাথমিক সাফল্যের ইঙ্গিত বলেই বিবেচিত হচ্ছে।
তবে শুধু কর ফাঁকি রোধ করে দীর্ঘদিন ধরে একই হারে রাজস্ব বৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের মতে, স্থায়ীভাবে রাজ্যের আয় বাড়াতে হলে অর্থনীতির পরিধিও বাড়াতে হবে। নতুন শিল্প, বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যবসার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলির উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত বাড়বে, ততই বাড়বে করের আওতা এবং সরকারের নিজস্ব রাজস্বের সম্ভাবনাও। সেই কারণে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি শিল্প ও বিনিয়োগ টানার উদ্যোগকেও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজ্যের বিপুল ঋণ এবং ক্রমবর্ধমান সরকারি ব্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধির এই প্রবণতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রথম তিন মাসের সাফল্য কতটা স্থায়ী হয়, এবং পুরো অর্থবর্ষে রাজস্ব আদায়ের এই গতি বজায় থাকে কি না—সেদিকেই এখন নজর অর্থনৈতিক মহলের।

No comments:
Post a Comment