কলকাতা: রাজ্যে পালাবদলের পর এবার প্রথম দুর্গাপুজো। ফলে কার্নিভাল হবে কি না, পুজোর উদ্বোধন কবে হবে, ক্লাবগুলো অনুদান হিসেবে কতটাকা পাবে, তা নিয়ে একাধিক জল্পনা ছিলই। এই আবহেই আজ সোমবার পুজো কমিটির সঙ্গে মিলন মেলা প্রাঙ্গণে বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপরই তিনি জানালেন পুজো নিয়ে একাধিক সিদ্ধান্তের কথা। মুখ্যমন্ত্রী জানান, অনুদান হিসেবে পুজো কমিটিগুলোকে দেওয়া হবে ১ লক্ষ টাকা। লাগবে না বিদ্যুতের টাকাও। তবে, সেইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মাতৃপক্ষের আগে কোনও পুজো উদ্বোধন হবে না। অর্থাৎ মহালয়ার পরই হবে পুজো উদ্বোধন। এমনকি কার্নিভালও হবে না। তবে, শারদ সম্মানের আয়োজন করা হবে সরকারের তরফে।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মেনে দুর্গাপুজো হবে। দুর্গাপুজো পালন করতে গিয়ে কাউকে যেন হাইকোর্টে যেতে না হয়, সেটা দেখা দরকার। এর জন্য বিগত দিনের মতো হাইকোর্টে গিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধ করতে হবে না। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে কার্নিভাল-এর নামে যেটা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, সেটা এ বার হচ্ছে না। আমাদের পর্যটন ও তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর মিলে সবথেকে বড় কর্মসূচি হবে ইডেন গার্ডেন-এ। ওখান থেকে হবে দুর্গা পুজোর সূচনা। চার ঘন্টার ড্রোন শো ও আতশবাজি শো হবে।
এদিন পুজো বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, সব ক্লাবকে অনুদান বাবদ দেওয়া হবে ১ লক্ষ টাকা। তবে বড় পুজো কমিটিগুলোকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, "বড় বাজেটের কমিটিকে আবেদন, আপনারা আর্থিক সাহায্য নেবেন না। আপনাদের আমি ধন্যবাদ জানাব।" পাশাপাশি অনুদানের জন্য কীভাবে আবেদন করতে হবে, তাও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, তৃণমূল আমলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুজো কমিটিগুলোকে অনুদান দেওয়া শুরু করেছিলেন। প্রথম বছর সব ক্লাবকে দেওয়া হয়েছিল ২৫ হাজার টাকা। পরবর্তীকালে সেই অনুদানের পরিমাণ বেড়েছে। গতবছর দুর্গাপুজোর অনুদান বাবদ ক্লাবগুলো পেয়েছিল ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করে। তবে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বড় ক্লাবগুলোকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে না। ফলত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে সেদিকেই নজর ছিল সকলের। এদিন সেটাই স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ঘোষণা, “বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়া হবে। কোনও লাইসেন্সের ঝামেলা থাকবে না। মন খুলে পুজো করুন। কিন্তু অনুদান দেওয়া নিয়ে একটু আপত্তি আছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে দিয়েছিলেন সেটি দৃষ্টিকটু। যাদের প্রয়োজন তাদেরই অনুদান দেওয়া হচ্ছে। বড় বাজেটের পুজোগুলিকে অনুরোধ, পুজোয় সরকারি আর্থিক সাহায্য নেবেন না। যাদের এই টাকা না হলে পুজো করতে পারবেন না তাদের সরকার এক লক্ষ টাকা করে দেবে। থানা পর্যায়ে আবেদন করতে হবে। সেখানেই যাচাই করে মুখ্যসচিবের কাছে পাঠানো হবে। মুখ্যসচিব অর্থ দপ্তরে পাঠিয়ে দেবে। ষষ্ঠীর আগে টাকা দিয়ে দেওয়া হবে।”
এছাড়াও পুজোর অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে সহজ পোর্টাল চালুর কথাও জানানো হয়েছে এদিন। পাশাপাশি প্রবীণ, বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি, বৃদ্ধাশ্রম ও বিভিন্ন আশ্রমের আবাসিকদের পুজো পরিক্রমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে আন্তঃদফতরীয় টিম গঠন করা হবে। পরিস্থিতি নজরে রাখতে ডিজিটাল মনিটরিং এবং নিয়মিত সমন্বয় বৈঠকের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
সেরা প্রতিমা, মণ্ডপ, পরিবেশবান্ধব পুজো, জনসমাগম ও ভিড় ব্যবস্থাপনা, মৃৎশিল্পী-সহ বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিচারক বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সাংস্কৃতিক ও শাস্ত্রীয় জ্ঞানসম্পন্ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিসর্জনের ক্ষেত্রেও প্রতিমার পবিত্রতা ও ঐতিহ্য রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ক্রেন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগের পদ্ধতি থেকে সরে এসে প্রতিমার মর্যাদা বজায় রাখার নির্দেশ থাকবে।
অন্যদিকে, পুজোকে কেন্দ্র করে যান চলাচল ও জননিরাপত্তার বিষয়েও একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহালয়ার আগে দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার পূর্বে পুজো বা উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজয়া দশমীর বিসর্জনের ক্ষেত্রে পঞ্জিকা মেনে চলার পাশাপাশি ঘাট ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কথা মাথায় রেখে একটি নির্দিষ্ট 'কাট-অফ' তারিখ রাখা হবে।
এছাড়াও দুর্গা পুজো নিয়ে সরকারের যেসব নির্দেশিকা রয়েছে, তা হল- গোটা রাজ্যের ক্ষেত্রে রাজ্য সড়ক ব্লক করে পুজো হবে না। কলকাতার ১৩টি রাস্তা ব্লক করে পুজো করা যাবে না। ডিজে বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, পুজো ও বিসর্জনেও ডিজে বাজানো নিষিদ্ধ করা হবে।লক্ষ্মীপুজো ২৫ অক্টোবর, তার আগে বিসর্জন শেষ করতে হবে। প্রতিমা, প্যান্ডেল, থিম বা সজ্জা- এমন কিছু করা যাবে না, যাতে দুর্গাপুজোর যে ধর্মীয় ঐতিহ্য রয়েছে, সেটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
সেইসঙ্গে অষ্টমীর দিন এই রাজ্যে সমস্ত মদের দোকান বন্ধ থাকবে। পানশালায় মদ বিক্রি করা যাবে না, বলেও জানানো হয়েছে।

No comments:
Post a Comment