'কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না', জিটিএ নিয়ে হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর! পাহাড়ের জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Tuesday, September 8, 2026

'কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না', জিটিএ নিয়ে হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর! পাহাড়ের জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা


নিজস্ব সংবাদদাতা, শিলিগুড়ি : উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি এবং একাধিক প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে মঙ্গলবার একদিনের ঝটিকা সফরে উত্তরবঙ্গে এলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী প্রথমে কালিম্পংয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত পাহাড়ে পৌঁছতে পারলেন না তিনি। মাঝ আকাশ থেকেই চপার ঘুরিয়ে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে ফিরে আসতে হয় মুখ্যমন্ত্রীকে। এরপর উত্তরকন্যায় টানা প্রায় চার ঘন্টার ম্যারাথন বৈঠকে উত্তরবঙ্গের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রশাসনিক পর্যালোচনা করেন তিনি।


এদিন সকাল থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর সফর ঘিরে কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছিল বাগডোগরা বিমানবন্দর, উত্তরকন্যা এবং কালিম্পংয়ের নির্ধারিত বৈঠকস্থল। নির্দিষ্ট সময়ে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে সেনাবাহিনীর চপারে কালিম্পংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। কিন্তু পাহাড়ের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কালিম্পংয়ে অবতরণ সম্ভব হয়নি। বেশ কিছুক্ষণ আকাশে চক্কর দেওয়ার পর বাধ্য হয়ে শিলিগুড়িতে ফিরে আসে চপার। এরপর উত্তরকন্যার পাশের ভিডিওকন গ্রাউন্ডে অবতরণ করেন মুখ্যমন্ত্রী এবং সেখান থেকে সড়কপথে উত্তরকন্যায় পৌঁছন।


উত্তরকন্যায় আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক-সহ বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিক এবং উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্তারা। বেলা প্রায় দুটো থেকে সন্ধ্যা ছ'টা পর্যন্ত চলে দীর্ঘ বৈঠক। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ জানান, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের প্রায় সমস্ত এইচওডি ভার্চুয়ালি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি রেল, বিমানবন্দর, বিএসএফ-সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরের আধিকারিকরাও বৈঠকে যোগ দেন। আগের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে এদিন বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।


বৈঠকে উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায়। মালদার ভূতনির বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। উত্তরবঙ্গের যে কোনও প্রান্তে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত মোকাবিলার জন্য এনডিআরএফ ও এসডিআরএফ-কে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের মাধ্যমে যে সমস্ত কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, সেইসব এলাকার মানুষের প্রতিক্রিয়াও নেওয়া হয়। রেল, বিমানবন্দর ও বিএসএফের জমি এবং নির্মাণ সংক্রান্ত যে সমস্ত সমস্যা এখনও বাকি ছিল, কেন্দ্র ও রাজ্যের আধিকারিকদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করিয়ে সেগুলির সমাধানের পথও বের করা হয়েছে।


পাহাড়ের জন্যও এদিন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। কালিম্পংয়ে যেতে না পারায় মুখ্যমন্ত্রী দুঃখপ্রকাশ করেছেন এবং খুব দ্রুত পাহাড় সফরে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান পর্যটনমন্ত্রী। পাশাপাশি ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের আওতায় পাহাড়ে প্রায় ২৫৪ কোটি টাকার কাজের ঘোষণা করা হয়েছে। এনএইচপিসির সঙ্গে যৌথভাবে এই কাজগুলি করা হবে। উত্তরকন্যা থেকেই যাতে উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু দফতরের কাজ পরিচালনা করা যায় এবং প্রতিটি বিষয়ে কলকাতায় ছুটতে না হয়, সেই বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে।


প্রতিবেশী নেপাল এবং মিরিক-সহ পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে সাম্প্রতিক ধসের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজ্য সরকার পাহাড়ের জন্য ২৫৪ কোটি টাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল মঞ্জুর করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সেচ দফতরের প্রধান সচিব রাজেশ সিনহা বর্তমানে পাহাড়ে অবস্থান করে সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক সতর্কতা তদারকি করছেন। এর পাশাপাশি, গত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের ধসে সর্বস্ব হারানো কালিম্পংয়ের ৭৩টি পরিবারকে ইতিপূর্বে জমি দেওয়ার পর, এ দিন পরিবার পিছু অতিরিক্ত ৩ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের কথা জানানো হয়।


এদিন প্রশাসনিক কর্মসূচিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য একাধিক সিদ্ধান্ত ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেন। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা রক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ব্লু-প্রিন্ট তুলে ধরেন তিনি।


কালিম্পংবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি মেনে সেখানে একটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন বাজেটে দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী জানান, কলকাতা থেকে রওনা হওয়ার আগেই তিনি স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়ে প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তী কালিম্পং সফরেই এই মেডিক্যাল কলেজের ভূমিপূজন সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। এ ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমার আওতায় কালিম্পং জেলায় ২ লক্ষ ১৮ হাজার ৫০৩ জন মানুষকে 'আয়ুষ্মান ভারত' কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যেই ১ লক্ষ ১৫ হাজার ৩১১টি কার্ড সক্রিয় হয়েছে। যাঁরা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন না, তাঁদের 'মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা'র অধীনে এনে বিনামূল্যে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।



জিটিএ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চেয়ারম্যান ও একাধিক সদস্যের পদত্যাগের পর আইএএস কর্তা মোহন্তীকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের স্থানীয় সাংসদ, বিধায়ক ও প্রতিনিধিদের পরামর্শ নিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বিগত দিনে জিটিএ-র শিক্ষক নিয়োগ, পানীয় জলের 'অমৃত' প্রকল্প এবং লেপচা ও তামাং বোর্ড-সহ ১১টি উন্নয়ন পর্ষদের তহবিলে হওয়া দুর্নীতির কঠোর তদন্তের হুঁশিয়ারি দেন তিনি। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি তদন্ত কাজ শুরু করেছে জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "সরকারি অর্থ যাঁরা লুট করেছেন, তাঁদের এফআইআর, গ্রেফতার ও অর্থ উদ্ধার করা হবে। কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।" পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও এ দিন স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।


মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "পাহাড়ের জনতাকে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হবে। চা-বাগান থেকে পর্যটন-সর্বত্র উন্নয়নের ধারা বজায় থাকবে।"


এদিন স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকে ঢেলে সাজানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, কোচবিহার, মালদা-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং পরিষেবা নিয়েও আলোচনা হয়। মাইগ্রেন্ট লেবারদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হয়েছে। বৈঠক শেষে ভিডিওকন গ্রাউন্ড হয়ে চপারে বাগডোগরা যাওয়ার কথা থাকলেও সেখানে কিছু বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সড়কপথেই বাগডোগরা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে বাগডোগরা থেকে বিমানযোগে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad