গ্যাংটক: জলবায়ু পরিবর্তন এবং নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মাঝেই সিকিমের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক অর্জিত হল। গ্যাংটকের বুলবুলের পাহাড়ি কোলজুড়ে অবস্থিত হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক চলতি বছরে তাদের সফল প্রজনন মরশুমের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। এক মরশুমেই পাঁচটি সুস্থ রেড পান্ডা শাবক, দুটি বিপন্ন হিমালয় ব্ল্যাঙ্ক বিয়ার বা কালো ভাল্লুক এবং চারটি হিমালয়ান গোরাল বা পাহাড়ি ছাগলের জন্ম কেন্দ্রটিতে এক আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে। বহু বছর ধরে চলা প্রাণপণ চেষ্টা এবং বৈজ্ঞানিক পরিচর্যার পর এই বিরল প্রানীদের জন্ম হওয়ায় উচ্ছ্বসিত পার্ক কর্তৃপক্ষ।
রেড পান্ডা প্রজনন কর্মসূচির জন্য এই সাফল্যর পিছনে রয়েছে এক ইতিহাস। ১৯৯৬-৯৭ সালে কেন্দ্রটিতে যখন রেড পান্ডা সংরক্ষণ ও কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচি চালু করা হয়, তখন থেকেই পার্ক কর্তৃপক্ষ নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভয়াবহ ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে এক এক করে ১২টি রেড পণ্ডার করুণ মৃত্যু হয়েছিল। এতে বিশাল ধাক্কা খায় প্রজনন প্রক্রিয়া এবং টানা সাত বছর কোনো পুরুষ প্রজননক্ষম রেড পান্ডা ছিল না পার্কে। এরপর ২০২২ সালে নতুন প্রজনন জোড়া আনা হয় এবং খোলা জঙ্গলে বেড়ে ওঠা আরও তিনটি পান্ডা পরে যুক্ত হওয়ায় খরা কাটে।
এবারের জুন ও জুলাই মাসে তিনটি পৃথক ধাপে মোট ছয়টি রেড পণ্ডা শাবকের জন্ম হয়েছিল। তবে চরম প্রতিকূল আবহাওয়া ও লাগাতার বৃষ্টির কারণে একটি শাবক মারা যায়, কিন্তু বাকি পাঁচটি পূর্ণ সুস্থ রয়েছে। 'সংরু ও পুণ্ডি' নামে দম্পতি অতিরিক্ত আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে বারবার তার বাচ্চাদের নিরাপদ ও শুকনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার প্রাকৃতিক চেষ্টা চালায়। চিকিৎসকদের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারিতে পাঁচটি শাবককেই বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে।
নবজাতকদের প্রাথমিক এই সংবেদনশীল দিনগুলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল বলে উল্লেখ করেন পার্কের ডিরেক্টর সাঙ্গে গ্যাৎসো। তিনি বলেন, “জুন ও জুলাই মাসে আমাদের কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচির আওতায় মোট ছয়টি রেড পান্ডার জন্ম হয়, যার মধ্যে পাঁচটি সফলভাবে বেঁচে গেছে। বিলুপ্তপ্রায় এই প্রজাতির সংরক্ষণে এটি আমাদের অত্যন্ত বড় একটি সাফল্য, কারণ এক বছরে এতগুলো পান্ডার জন্ম আমাদের ইতিহাসে এই প্রথম।”
তিনি আরও জানান, “জন্মের পর প্রথম দুই মাস পান্ডা শাবকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মতো থাকে। এটি অত্যন্ত সংকটজনক একটি সময়। তাই এই ঝুঁকি এড়াতে আমরা শুরু থেকেই অভিজ্ঞ পশুচিকিৎসক ও কর্মীদের মাধ্যমে নিবিড় নজরদারিতে রেখেছিলাম এবং সব পরিস্থিতি অনুকূলে আসার পরই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিই।” বর্তমানে এই উদ্যানে মোট রেড পান্ডার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩-তে, যার মধ্যে ছয়টি স্ত্রী এবং চারটি পুরুষ পণ্ডা রয়েছে।"
শুধু রেড পণ্ডাই নয়, সিকিমের অন্যান্য বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সুরক্ষাতেও পার্কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বৃক্ষছেদন এবং বেআইনি শিকারের কারণে হুমকির মুখে থাকা দুটি হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার ছানার জন্ম হয়েছে। পাশাপাশি গত বছরের শেষদিকে এই উদ্যান থেকে ছয়টি পুরুষ হিমালয়ান গোরালকে সফলভাবে বনের মুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর এবার আরও চারটি নতুন গোরাল ছানার জন্ম ভবিষ্যতে তাদের আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সুদৃঢ় করল।
বর্তমানে প্রায় ২৩০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্কে ১৩টি ভিন্ন প্রজাতির মোট ৯২টি বন্যপ্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে ক্লাউডেড লেপার্ড, হিমালয়ান টার এবং শকুন অন্যতম।
সিকিমের বন ও পরিবেশ দপ্তরের এক আধিকারিক এই সাফল্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আমাদের পার্কের প্রজনন ব্যবস্থার এই অগ্রগতি সিকিমের সার্বিক জীববৈচিত্র্যের জন্যই অত্যন্ত খুশির। বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশের পরেই ভারতের মধ্যে সিকিমে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক—প্রায় ৩০০টির মতো বুনো রেড পান্ডা স্বাধীনভাবে বসবাস করে।” সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রেখে প্রাণীগুলোকে বড় করে তোলার যে নিরলস প্রচেষ্টা পার্কের বায়োলজিস্ট ও জুকিপাররা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা আগামী দিনে পূর্ব হিমালয় অঞ্চলের বন্যপ্রাণী রক্ষায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

No comments:
Post a Comment