বিনোদন ডেস্ক, ৩১ অক্টোবর ২০২৬: হরর ছবির গল্পে রহস্য, আতঙ্ক আর অজানা ভয়—এই তিনের মিশেল দর্শকদের বরাবরই আকৃষ্ট করে। এবার সেই আবহ নিয়েই বড়পর্দায় হাজির হয়েছে নতুন ছবি '৪১৮'। সম্প্রতি (২৩ অক্টোবর ২০২৬) প্রেক্ষাগৃহে হিন্দিতে মুক্তি পেয়েছে দক্ষিণের এই হরর ছবিটি, যার গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি মেডিক্যাল কলেজের হস্টেল এবং তার রহস্যে ঘেরা একটি ঘরকে কেন্দ্র করে। একদিকে পড়ুয়াদের দৈনন্দিন জীবন, অন্যদিকে একটি পুরনো ভবনের ভয়ংকর অতীত। যে অতীতের কথা জানলে শিউরে উঠতে পারেন যে কেউ। বিশেষ বিষয় হল, এটি হিন্দিতে এসেছে এবং ছবিটি প্রযোজনা করেছেন 'কেজিএফ' খ্যাত পরিচালক প্রশান্ত নীল। ছবির শুরুটা বেশ জমজমাট। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দর্শকদের ভয় দেখিয়ে এবং গল্পের সঙ্গে বেঁধে রাখতে কতটা সফল হয়েছে এই ছবি? সত্যিই কি সেখানে ভূত রয়েছে? আর ৪১৮ নম্বর ঘরের রহস্যই বা কী? জেনে নেওয়া যাক ছবির রিভিউ।
কী রয়েছে ছবির গল্পে?
'৪১৮' ছবিটি পরিচালনা করেছেন কীর্তন নাগগোড়া। ছবির মূল চরিত্র বিবেক শঙ্কর (সূর্য রাজ বীরবাথিনী)। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে বিবেকের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তার বাবা-মাকে নিজেদের বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয়। এরপর কর্নাটকের একটি মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পায় সে। সেখানে নতুন করে সংস্কার করা একটি হস্টেলে থাকতে শুরু করে বিবেক।
প্রথম দেখায় হস্টেলটিকে আর পাঁচটা সাধারণ হস্টেলের মতোই মনে হয়। কিন্তু ভবনটির অতীত অত্যন্ত ভয়ংকর। প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ থাকা এই বাড়িতে একসময় মানসিক হাসপাতাল ছিল। হস্টেলে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এমনকি ৪১৮ নম্বর ঘরে কাউকে ঢোকার অনুমতিও দেওয়া হয় না। শুরুতে এই সমস্ত বিষয়কে সাধারণ নিয়ম ভেবেই নিজের মতো জীবন কাটাতে থাকে বিবেক। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তার সঙ্গে ঘটতে শুরু করে অদ্ভুত সব ঘটনা। ধীরে ধীরে হস্টেলের রহস্য তার সামনে উন্মোচিত হতে থাকে। গল্পও মোড় নেয় ভয়ংকর দিকে।
ছবির শুরু ও পরিচালনা কতটা আকর্ষণীয়?
ছবির শুরুটা বেশ শক্তিশালী। প্রথম দৃশ্য থেকেই পরিচালক কীর্তন নাগগোড়া দর্শকদের নিয়ে যান এক ভীতিকর পরিবেশে। রক্তাক্ত এক মহিলার নিজের পরিচিতদের উপর আক্রমণের দৃশ্য ছবির শুরুতেই যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। এই দৃশ্য দেখে মনে হয়, পরবর্তী অংশেও ভয় ও রোমাঞ্চের দুর্দান্ত মিশেল উপভোগ করতে পারবেন দর্শক।
তবে শুরুর সেই আকর্ষণীয় আবহের পর ছবির গতি কিছুটা কমে যায়। হস্টেলের দৈনন্দিন জীবন, র্যাগিং এবং অন্যান্য চরিত্রের পার্শ্বকাহিনীতে জড়িয়ে পড়ে মূল গল্প। এই অংশগুলিতে ভয়ের অনুভূতিও কিছুটা কমে যায়। মনে হয়, ছবি তার মূল গল্প থেকে সাময়িকভাবে সরে যাচ্ছে। তবে বিবেক যখন হস্টেলে অস্বাভাবিক কিছু ঘটনার সম্মুখীন হতে শুরু করে, তখন আবার গল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
ইন্টারভেলের পর গল্প কোন দিকে মোড় নেয়?
ইন্টারভেলের পর ছবির গল্প এগিয়ে যায় দেবিকা (চৈত্রা জে আচার)-এর অতীতকে কেন্দ্র করে। এই অংশেই ৪১৮ নম্বর ঘর বন্ধ রাখার কারণ এবং জায়গাটির ভয়ংকর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাধিক রহস্য সামনে আসে।
তবে সমালোচকদের মতে, এখানেই ছবির একটি বড় দুর্বলতা চোখে পড়ে। রহস্যের পর্দা ধীরে ধীরে সরিয়ে দর্শকদের চমকে দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই জায়গায় ছবিটি পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। দ্বিতীয় ভাগে একাধিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেও প্রতিটি নতুন তথ্য দর্শকদের মধ্যে সমানভাবে রোমাঞ্চ তৈরি করতে পারে না। কিছু জায়গায় গল্প অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ বলেও মনে হয়।
একটি হরর ছবিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভয় ও উত্তেজনার আবহ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেই জায়গায় '৪১৮' প্রতিবার সফল হতে পারেনি। গল্পের বেশ কিছু জায়গায় রহস্যকে আরও জোরালো করে তোলার সুযোগ ছিল। তা সত্ত্বেও ৪১৮ নম্বর ঘরকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি ছবির পরবর্তী অংশ দেখার আগ্রহ ধরে রাখে।
ভয় দেখাতে জাম্প স্কেয়ারের ব্যবহার
হরর ছবিতে হঠাৎ করে সামনে চলে আসা ভয়ংকর দৃশ্য বা জাম্প স্কেয়ার দর্শকদের চমকে দেওয়ার অন্যতম পরিচিত কৌশল। '৪১৮' ছবিতেও একাধিক জায়গায় এই পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়েছে। তীব্র শব্দ এবং আচমকা সামনে চলে আসা ভীতিকর দৃশ্যের মাধ্যমে দর্শকদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা।
কিছু দৃশ্যে এই কৌশল কার্যকর হলেও বারবার একই পদ্ধতি ব্যবহার করার ফলে ভয়ের প্রভাব কিছুটা কমে যায়। ছবিতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে দর্শকদের মনে সবসময় অজানা বিপদের আশঙ্কা থাকবে। কিন্তু সাউন্ড ডিজাইনের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আতঙ্ক তৈরি করার পরিবর্তে অনেক জায়গায় আচমকা চমকে দেওয়ার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
সিনেমাটোগ্রাফি ও সঙ্গীত কেমন?
ছবির প্রযুক্তিগত দিকের কথা বলতে গেলে দিনেশ দিবাকরের সিনেমাটোগ্রাফি ভয়ংকর পরিবেশ তৈরিতে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। হস্টেলের পুরনো ভবন, নির্জন করিডর এবং বন্ধ ঘরকে ঘিরে থাকা রহস্যময় জগৎ পর্দায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বেশ কিছু দৃশ্যে ক্যামেরার ব্যবহার গল্পের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় এবং দর্শকদের সেই পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হতে সাহায্য করে।
ভেঙ্কি জিজির সঙ্গীতও ছবির আবহের সঙ্গে মানানসই। তবে সম্পাদনার ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। আকুল অবিনাশের সম্পাদনায় কয়েকটি জায়গায় 'কেজিএফ' এবং 'সালার'-এর মতো ছবির নির্মাণশৈলীর প্রভাব অনুভূত হয়। কিন্তু সেই ধরণ সবসময় গল্পের পক্ষে কাজ করেনি। কিছু দৃশ্য আরও সংক্ষিপ্ত করা যেত। তাতে ছবির গতি বাড়ত এবং ভয়ের আবহও আরও দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব হত। এমনটাই মনে করছেন অনেকে।
ছবিটি কি কোনও গভীর বার্তাও দেয়?
'৪১৮' শুধুমাত্র ভূত-প্রেত কিংবা ভয়ংকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি। ছবির গল্পে নারীদের যন্ত্রণা, তাঁদের প্রতি হওয়া অন্যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকেও জায়গা দেওয়া হয়েছে। উদ্বেগ ও অবসাদের মতো সমস্যাগুলিকে গল্পের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা।
ছবিটি বোঝাতে চেয়েছে, কোনও ব্যক্তির মানসিক অবস্থা এবং তাঁর অভিজ্ঞতা না বুঝে তাঁকে অবহেলা করা বা তাঁর সমস্যাকে অস্বীকার করা ঠিক নয়। এই দিকটি ছবিকে শুধুমাত্র ভয় দেখানোর গণ্ডি থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেছে। তবে এই বিষয়গুলিকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরা হলে ছবির আবেগঘন দিকটি আরও শক্তিশালী হতে পারত বলেই মত অনেকের।
সব মিলিয়ে, হরর ঘরানায় '৪১৮' একটি মোটামুটি ভালো প্রচেষ্টা। ছবির জমজমাট শুরু, ভয়ংকর পরিবেশ এবং হস্টেলের রহস্য ঘিরে তৈরি গল্প দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করে। ছবিতে এমন কিছু দৃশ্যও রয়েছে, যা সত্যিই ভয় ধরাতে পারে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য এবং নারীদের যন্ত্রণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে গল্পে জায়গা দেওয়াও ছবির অন্যতম ইতিবাচক দিক। আর যাঁরা হরর ছবি দেখতে ভালোবাসেন এবং ভয়ংকর দৃশ্যের পাশাপাশি রহস্যে মোড়া গল্প উপভোগ করতে পছন্দ করেন, তাঁরা '৪১৮' দেখতেই পারেন।

No comments:
Post a Comment