বিনোদন ডেস্ক, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: নব্বইয়ের দশকের কচিকাঁচাদের কাছে সুপারহিরো মানেই ছিল 'শক্তিমান'। শুধু ছোটরাই কেন, শক্তিমানের অনবদ্য সাহস ও অকল্পনীয় শক্তি আকর্ষণ করেছিল বড়দেরও। ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ছোট পর্দায় রাজত্ব করে এই ধারাবাহিক। এই ধারাবাহিকেরই অন্যতম চরিত্র ছিলেন গীতা বিশ্বাস; একজন নির্ভীক-সৎ সাংবাদিক। শক্তিমান-গীতা জুটির জনপ্রিয়তা আজও কিন্তু মুখে-মুখে। কিন্তু জানেন কী পর্দার গীতার বাস্তব জীবন ছোট থেকেই কেটেছে কঠিন সংঘর্ষে? আজ্ঞে হ্যাঁ, ছোট থেকেই নানান জটিলতায় জড়িয়েছিলেন অভিনেত্রী বৈষ্ণবী ম্যাকডোনাল্ড তথা শক্তিমানের গীতা। তবে, এতকিছুর পরেও হাল ছাড়েননি অভিনেত্রী।
বৈষ্ণবী একবার একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, তার বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে তাকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছিল। গীতা বিশ্বাস বলেন, 'বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়ার কারণে আমরা হোটেলে থাকতাম। আমরা এক হোটেল থেকে অন্য হোটেলে যেতে থাকি। আমি কীভাবে স্কুলে যেতে পারতাম?' চতুর্থ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছয় বছরের স্কুলের নিয়মমাফিক পড়াশোনা না করার পরেও, বৈষ্ণবী একজন মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। তিনি অভিনেত্রী নয়, একজন বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, ভাগ্য হয়তো তার জন্য অন্য পরিকল্পনা করেছিল।
অভিনেত্রীর পরিবার যখন হায়দ্রাবাদে একটি ভাড়া বাড়িতে চলে আসে, তখন তারা অনুভব করেন যে, জীবন কিছুটা ভালো হচ্ছে। কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর বাবা কোনও কিছু না জানিয়েই নিখোঁজ হয়ে যান। বৈষ্ণবী এই বিষয়ে বলেন, "১৪ বছর বয়সে, আমি ঈশ্বরের সাথে কথা বলতে শুরু করি, তাঁকে জিজ্ঞাসা করি যে, তিনি কি আমাদের সমস্যাগুলি দেখতে পাচ্ছেন না? দুই বা তিন মাসের মধ্যে, আমার বাবা নিখোঁজ হয়ে যান। আমরা তাঁকে খুঁজেও পাইনি।"
কোনও আয় বা আশ্রয়-সহায় না থাকায়, তাঁর মা কিছু টাকা ধার করেছিলেন। এরপর তিনি বৈষ্ণবী এবং তাঁর ছোট বোনের সাথে তাদের বাবাকে খুঁজতে মুম্বাই চলে যান। এই সময়ে তাঁরা একটি লজে থাকতেন এবং বাবাকে খুঁজতে শুরু করেন। কিছু সময় পর ভাড়া ও খাবারের জন্য টাকা না থাকায় বৈষ্ণবীর মা খুব সমস্যায় পড়ে যান এবং তিনি সকলের জীবন শেষ করার কথা ভাবেন।
বৈষ্ণবী বলেন, "আমার মা আত্মহত্যা করার এবং আমাদের প্রাণে মারার কথা ভাবেন। পরে তিনি বলেছিলেন যে, আমাদের খাবারে কিছু মিশিয়ে দিতেন। তখন আমার বয়স ছিল ১৬ আর আমার বোনের ১২। তিনি চাননি যে আমরা ভুল হাতে পড়ি।" এরপর তাঁর মা তাদের একটি গির্জায় নিয়ে যান। বৈষ্ণবী বলেন, সেখান থেকে তাঁদের জীবন একেবারে বদলে যায়।
অভিনেত্রী বলেন, "আমার এক অতিপ্রাকৃত অনুভব হয়। আমি ভগবানের শক্তি অনুভব করি এবং কাঁদতে থাকি। আমরা যখন আমাদের লজে ফিরে আসি, তখন দরজার বাইরে ১০০ টাকার নতুন নোটের একটি বান্ডিল দেখতে পাই; ঠিক ততটাই, যা আমাদের বিল পরিশোধের জন্য জরুরি ছিল। তখন থেকে আমি ভগবানের ওপর বিশ্বাস করতে শুরু করি। দুই সপ্তাহের মধ্যে, আমরা একটি সম্পূর্ণ সজ্জিত ১-বিএইচকেতে চলে আসি। এই সব ছিল একটি চমৎকার।"
এর দুই বছর পর তিনি তার বাবার দেখা পান, যিনি নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে নিয়েছিলেন এবং ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এসময় তিনি বুঝতে পারেন কেন বাবা তাঁদের ছেড়ে গিয়েছিলেন। অভিনেত্রী বলেন, "আমি তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম... যখন তিনি মৃত্যুশয্যায়, তখন আমি তাঁর সাথে ছিলাম।"
বৈষ্ণবী ওরফে গীতা প্রথম শিশুশিল্পী হিসেবে রামসে ব্রাদার্সের কাল্ট হরর ছবি বীরানা (১৯৮৮) -এ পরিচিতি পান, যেখানে তিনি জেসমিনের শৈশবের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তবে, এতে কাজ করা তাঁর জন্য অভিশাপ হয়ে ওঠে। অভিনেত্রী বলেন, এতে কাজ করার পর আমার সাথে অদ্ভুত-অদ্ভুত অনুভব হতে শুরু করে। আমি উঠে হাঁটতে শুরু করতাম। আমি জেগে থাকতাম কিন্তু হাঁটা থামাতে পারতাম না। এটি প্রায় এক মাস ধরে চলতে থাকে।
এর পরে, তিনি চলচ্চিত্র জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। বেশ কয়েকটি ছবি তাঁর হাতে আসে কিন্তু সবগুলোই বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া, কোনও না কোনও কারণে তাঁকে বেশ কয়েকটি ছবি থেকে বাদ দেওয়া হয়। অভিনেত্রী বলিউডের বিরুদ্ধে র্যাগিংয়ের অভিযোগ করেন। এর পরে, তিনি টেলিভিশনের দিকে পা বাড়ান।
চলচ্চিত্র জগতের বিষাক্ততায় বিরক্ত হয়ে বৈষ্ণবী টিভি জগতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মা আশঙ্কা করেছিলেন যে, তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। এরপর বৈষ্ণবীকে "শক্তিমান"- গীতা বিশ্বাসের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং তিনি তা গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্ত অভিনেত্রীর জন্য ইতিবাচক প্রমাণিত হয় এবং এই ভূমিকা-ই তাঁকে নব্বইয়ের দশকের টেলিভিশন আইকন বানিয়ে দেয়।
এর পরে, তিনি "মিলে জব হাম তুম", "সাপনে সুহানে লড়কপান কে", "তাশন-এ-ইশক", "কিয়োঁ উঠে দিল ছোড় আয়ে", "মিট" এবং "পরিণীতি" সহ বেশ কয়েকটি শোতে অভিনয় করেছিলেন। উল্লেখ্য, "শক্তিমান" ১৯৯৭ সালে শুরু হয় এবং এর শেষ পর্ব ২০০৫ সালে প্রচারিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি প্রায় আট বছর ধরে মানুষের হৃদয়ে রাজত্ব করেছিল। এর সংলাপ এবং চরিত্রগুলি আজও মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে।

No comments:
Post a Comment