কলকাতা: "যারা বাংলার মানুষকে জব্দ করতে চেয়েছিলেন, জব্দ তাঁরা ভোট বাক্সে হয়ে গেছেন", বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারকে এভাবেই কটাক্ষ করলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার বিকেলে সমাজমামাধ্যমে এক ভিডিও বার্তা পোস্ট করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সেখানেই তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন বাংলায় চতুর্থবার মা-মাটি-মানুষের সরকার গঠন হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁর দাবী, এক্সিট পোলে যা দেখানো হয়েছে, সেইসব বিজেপি টাকা দিয়ে করিয়েছে।
এদিন ভিডিও বার্তার শুরুতেই বাংলার মানুষকে কৃতজ্ঞতা জানান মমতা। তিনি বলেন, 'এত রোদ এবং সবকিছু অত্যাচার সহ্য করে আপনারা যেভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। আপনাদের প্রতি আমি অনেক কৃতজ্ঞ।'
পাশাপাশি দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, "আমি আমার কর্মীদের কাছেও খুব কৃতজ্ঞ। যারা অনেক লড়াই করেছেন সেন্ট্রাল ফোর্স এবং এখানকার ফোর্স সবার যৌথ অত্যাচার সহ্য করে।" মমতা বলেন, "প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে পুরো ভারত সরকার, ১৯টা রাজ্যের বিজেপি নেতাদের এবং অর্থভাণ্ডার শক্তি ভাণ্ডার, বন্দুকের ভাণ্ডার নিয়ে যারা বাংলার মানুষকে জব্দ করতে চেয়েছিলেন, জব্দ তাঁরা ভোট বাক্সে হয়ে গেছেন।"
মমতা দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, "আমরা ২২৬ পার করবো ২০২৬-এ। মানুষ যে বিপুলভাবে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার পুরো ভরসা, বিশ্বাস-আস্থা আছে।"
তাঁর দাবী, বিজেপি এক্সিট পোল করিয়েছে টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, "আমি আপনাদের নিশ্চিন্ত করে বলতে চাই, যেটা টিভিতে দেখাচ্ছে এটা বিজেপির অফিস থেকে কালকে বেলা ১টা ৮ মিনিটে সার্কুলেট করেছে এবং টাকা দিয়ে বলেছে, যাতে এটা দেখানো হয়। আমার কাছে নির্দিষ্ট খবর আছে। ওরা কালকে এটা গদি মিডিয়াকে দিয়ে করিয়েছে। তার কারণ ওরা ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স সবাইকেই চমকায়।'
কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধেও এদিন সরব হন মমতা। তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, "সেন্ট্রাল ফোর্স যে ব্যবহার কাল করেছে এবং যে নতুন পুলিশগুলো নিয়োগ হয়েছিল যারা আমার হাতে ছিল না, তারা ভীষণ মেয়েদের মেরেছে, বাচ্চাদের মেরেছে। এক ভদ্রলোক উদয়নারায়নপুরে ভোট দিতে গিয়ে মারা গেছেন। সেই শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার নেই। কিন্তু সেই পরিবারের পাশে আমরা থাকব।" তাঁর দাবী, তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা এমনকি সাংবাদিকদেরও মারা হয়েছে ভবানীপুর চক্রবেড়িয়ায়। তিনি বলেন, 'একতরফা মেরেছে।'
এক্সিট পোল নিয়ে মমতা আরও বলেন, "ওটা বিজেপির চক্রান্ত এবং বিজেপি এতগুলো মানুষের অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করতে পারল না,তাই বিজেপি শেষ খেলাটা খেলেছে সংবাদমাধ্যমকে দিয়ে। যাতে উল্টাপাল্টা বলে মানুষের মনোবলটা ভেঙে যায়। আসল সত্যিটা বেরোলে শেয়ার বাজারে ধ্বস নামবে। সেজন্য শেয়ার বাজারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে এটা করেছে। আমার কাছে নির্দিষ্ট খবর আছে।"
তাঁর বক্তব্য, "আমি পরিষ্কার বলছি ২০১৬-তেও এক জিনিস হয়েছে ২০২১-এও এক জিনিস হয়েছে। ওরা বারবার করে এক্সিট পোল যা দেখিয়েছে টোটালটাই দেখিয়েছে বিজেপির কথায়।" তিনি বলেন, "আজকে নিরপেক্ষতা বলে ভারতবর্ষে কিছু নেই। সব এক পক্ষ হয়ে গেছে।"
সেইসঙ্গে দলের প্রতি তাঁর বার্তা, গণনা কেন্দ্রে সবাই যেন পাহারা দেন। তিনি বলেন, গণনায় আজ থেকে সবাই যেন সমানভাবে পাহারা দেয়। দরকার হলে আমিও আমার এলাকায় পাহারা দিতে নামব। আমাদের ২৯৪ টা যে প্রার্থী, সবাইকে বলব নিজেরা পাহারা দিন। দিনের বেলায় কর্মীদের রাখুন, রাতের বেলায় নিজেরা থাকুন। আমি যদি পাহারা দিতে পারি আপনারাও পাহারা দিতে পারেন। রাত জাগুন। সকালে অন্য দলকে হস্তান্তর করে তারপর ঘুমাবেন। কারণ কাউন্টিংয়ের জন্য মেশিন নিয়ে যাওয়ার সময় ওটা বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা ওরা করেছে। সুতরাং নজর রাখতে হবে কোনও রকম অবহেলা যেন না হয়। আর গণনা এমন ভাবে করবেন, যোগ্য লোককে দেবেন। আমি যতক্ষণ সাংবাদিক সম্মেলন করে না বলব ততক্ষণ কেউ গণনার টেবিল ছাড়বেন না।"
এরপরেই তিনি সতর্ক করে বলেন, "মনে রাখবেন টেবিলে যেটা গোনা হয় তারপর ওরা কম্পিউটারে আপলোডের সময় সেটা পাল্টে দেয়; মানে আমাদেরটা দিয়ে দেয় বিজেপিতে আর বিজেপিরটা দিয়ে দেয় আমাদের। সেদিকেও নজর দিন সতর্ক থাকুন।"
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "আমি নিজেও গণনা কেন্দ্রে হানা দেব। কারণ আমি প্রার্থী হিসেবে যেতেই পারি। সেরকম সব প্রার্থী বসে থাকবেন। যখন দেখবেন ওয়াশরুমে যেতে হবে বা খাবার খেতে যেতে হবে, একজন বিশ্বস্তকে বসিয়ে তবেই যাবেন, তাও ২ মিনিটের জন্য। তাছাড়া যাবেন না। এত কষ্ট করেছেন এটুকু কষ্ট কিন্তু করতে হবে বাংলা মায়ের জন্য। বাংলার মানুষকে বাঁচানোর জন্য, বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য।"
তাঁর বার্তা, "সবাই শান্ত থাকবেন, সংযত থাকবেন। দিদির প্রতি ভরসা রাখুন, বাংলার মানুষের প্রতি ভরসা রাখুন। আমাদের মা-মাটি-মানুষের সরকারই আমরা গঠন করছি এবং করব। নিশ্চিন্তে থাকুন।"
কর্মীদের উদ্দেশ্যে বার্তা, "নিশ্চিন্তে শান্ত হয়ে সংযত ভাবে থাকুন। ওরা হামলা করলেও আপনারা এক্ষুনি হামলাতে যাবেন না। আমি জানি কাল বেহালায় হামলা করেছে, অনেক জায়গায় অত্যাচার করেছে। ভাঙরে আমার কর্মীদের যেভাবে পেটানো হয়েছে, রক্তাক্ত করা হয়েছে এর জবাব ওদের দিতেই হবে আগামী দিনে। এর জন্য আমরা ব্যবস্থা করব আপনাদের আইন হাতে তুলে নেওয়ার দরকার নেই।"
তিনি বলেন, "আমি প্রশাসনকে বলব, অনেক খেল আপনারা দেখিয়েছেন বিজেপির কথায়। দয়া করে গণনায় আমাদের ছেলে-মেয়েদের গায়ে বা মানুষের গায়ে বা কোন রাজনৈতিক দলের গায়ে হাতে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। অনেক পিটিয়েছেন আর নয়। অনেক হয়েছে আর না। বাংলা আপনাদের নয়। বাংলার মা মাটি মানুষ বাংলার দখলে। বাংলার বহিরাগতকে সমর্থন করে না।"
তাঁর দাবী, বিজেপির নিজস্ব এজেন্ট নেই কোনও বুথে সেজন্য সেন্ট্রাল ফোর্সকে কাজে লাগিয়ে ওরা ওদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে এবং অমিত শাহর সরাসরি দখলদারিতে। এটা করা যায় না।
মমতার প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী ভোট চলাকালীন কাল সাড়ে চারটায় বললেন কি করে, পুরো বাংলাটা ওনার? উনি বাংলাকে চেনেন? উনি বাংলার মাটি চেনেন? রবীন্দ্র-নজরুলকে চেনেন? নেতাজি-গান্ধীজিকে চেনেন? রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর কে চেনেন? কাউকে চেনেন না। শুধুমাত্র কানে কানে কথা বলো আর মিথ্যা কথা বলে যাও অপপ্রচার করে যাও।"
তাঁর অভিযোগ, কাউকে কাউকে খামে করে তিন হাজার টাকা দিয়েছে বিজেপি এবং সে খবর তাঁর কাছে আছে। তিনি বলেন, "ভাণ্ডারের নামে টাকা দিয়েছে, যারা টাকা নিয়েছেন তারা খুব ভুল করেছেন। তবু মনে রাখবেন আমরা নিশ্চয়ই আপনাদের ভুল বুঝব না। ভোট যাকেই দিয়ে থাকুন, অর্থের বিনিময়ে ভোট দেওয়াটা ঠিক নয়। কিন্তু আমার বিশ্বাস আছে আপনারা সঠিক দায়িত্ব পালন করেছেন, আগামী দিনে আপনাদের অধিকার রক্ষার জন্য।"
মমতা আরও বলেন, "আমি নিশ্চিন্ত করে বলে যাচ্ছি, বাংলার জয় হবে। বাংলা করবে জয়। বাংলার মা করবে জয়। বাংলার মা-মাটি-মানুষের হবে জয়। এটুকু বিশ্বাস আপনারা আমার প্রতি রাখতে পারেন। তাই ইভিএম মেশিন ও গণনা; প্রার্থীরা একটু নিজেরা মাঠে নামুন। আমি তিন রাত জেগেছি গার্ড করার জন্য।
তাঁর কথায়, 'আমি একমাস দশ দিন কাজ করেছি এই রোদ্দুরের মধ্যে, ৫০ লু নিয়ে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে যা গরম ছিল আর মানুষ যেভাবে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন, সবাই অত্যাচারিত হয়েছেন। এক তো এসআইআরের অত্যাচার, এক হচ্ছে সেন্ট্রাল ফোর্সের অত্যাচার। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষ রায় দিয়েছেন।
সবশেষে কটাক্ষের সুরে তিনি বলেন, "বিজেপি যতই ভাবুন, ভেবেই বসে থাকুন। যতই অপপ্রচার করুন, মনে রাখবেন জবাব পাবেন ৪ তারিখের সন্ধ্যার মধ্যে। অপেক্ষা করুন।"

No comments:
Post a Comment