কলকাতা: আগামী ২৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রথম দফার নির্বাচন। এই দফায় রাজ্যের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের মোট ১৬ জেলার ১৫২ আসনে ভোট নেওয়া হবে। তার আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই আসনগুলিতে নির্বাচনী প্রচারণার সময়সীমা শেষ হল। নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই আসনগুলিতে যেমন প্রতিটি দলের প্রার্থীরা জনসংযোগ করেছেন, তেমন প্রার্থীদের সমর্থনে তারকা প্রচারকরাও প্রচারণায় অংশ নেন।
মঙ্গলবারও আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের সমর্থনে একটি রোড শো'য়ে অংশ নেন দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা। কুলটি আসনের বিজেপি প্রার্থী পোদ্দারের সমর্থনে নির্বাচনী সভায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নন্দীগ্রাম আসনে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই শেষ দিনের প্রচারে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সাথে নিয়ে জনসংযোগে উপস্থিত ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও চারটি নির্বাচনী কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
যদিও মঙ্গলবার প্রথম দফার নির্বাচনী প্রচারণা শেষ দিনে বিক্ষিপ্ত কিছু অশান্তির ঘটনা ঘটে। পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনে বিজেপি প্রার্থী অজিত কুমার জানার ওপর হামলার অভিযোগ উঠে। এই হামলায় তাঁর একটি হাত ভেঙে গিয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁকে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয় প্রার্থীর গাড়ি এবং একাধিক মোটর বাইক। এই হামলায় আরও কয়েকজন বিজেপি কর্মী-সমর্থক আহত হন। গোটা ঘটনায় তৃণমূল আশ্রিত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী হুমায়ুন কবীরের প্রচারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায় মুর্শিদাবাদের নওদা বিধানসভায়। পুলিশের বিরুদ্ধে হুমায়ুনের প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। আর তাতেই পুলিশের সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন প্রার্থী।
অন্যদিকে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগে নন্দীগ্রামের এক তৃণমূল নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি হাবিবুল রহমান ওরফে নান্টু নন্দীগ্রামের মোহাম্মদপুর পঞ্চায়েতের প্রধান পদে রয়েছেন।
আগামী ২৩ এপ্রিল, সকাল ৭টায় শুরু হবে ভোটগ্রহণ, কোনরকম বিরতি ছাড়াই, তা শেষ হবে সন্ধ্যা ৬টায়। প্রথম দফায় মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ কোটি ৮৪ লাখ, নারী ভোটার ১ কোটি ৭৫ লাখের মতো এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪৬৫ জন।
আসন্ন নির্বাচনে একদিকে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস লড়াইয়ের ময়দানে রয়েছে, তেমন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিআইএম, ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ), আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি) সহ অন্য দলগুলিও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। যদিও বেশিরভাগ আসনেই লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে।
প্রথম দফায় ১৪৭৮ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদায়ন গুহ (দিনহাটা), সেচমন্ত্রী মানুষ ভূঁইয়া (সবং), শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক (আসানসোল উত্তর), এশিয়ান গেমসে স্বর্ণজয়ী অ্যাটলিট স্বপ্না বর্মন (রাজগঞ্জ), প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেব (শিলিগুড়ি)।
বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী (নন্দীগ্রাম), দিলীপ ঘোষ (খড়গপুর সদর), প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক (মাথাভাঙ্গা), প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার অশোক দিন্দা (ময়না), ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পাল (আসানসোল দক্ষিণ)।
কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী (বহরমপুর), মৌসম বেনজির নুর (মালতিপুর), আলী ইমরান রামজ (চাকুলিয়া)। আমজনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর (রেজিনগর ও নওদা)।
নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে জাতীয় নির্বাচন কমিশন একাধিক পদক্ষেপ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে ২,৪০০ কোম্পানি (২ লাখ ৪০ হাজার সদস্য) কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়ন। রাজ্যের নির্বাচনের ইতিহাসে এই প্রথম এত সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে।
প্রথম দফায় ১৫২ আসনের জন্য মোট ৪৪ হাজার ৩৭৮ টি ভোট গ্রহণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এই ভোট গ্রহণ কেন্দ্রগুলির ভেতরে এবং বাইরে লাগানো থাকবে অন্তত দুইটি ক্যামেরা এবং ওয়েব ক্যাস্টিং সফটওয়্যার। প্রতিটি বুথ থেকে ওয়েবকাস্টিং করা হবে। তার মাধ্যমেই কন্ট্রোল রুমে থাকা নির্বাচনী পর্যবেক্ষণের কাজে নিযুক্ত আধিকারিকরা সরাসরি ওই বুথ থেকেই ভিডিও দেখতে পারবেন। আধিকারিকদের তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করার জন্য কাজে লাগানো হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) -কে। পাশাপাশি ২,১৯৩ টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) মোতায়েন রাখা হচ্ছে। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, ভোট চলাকালীন বুথ দখল বা অশান্তির খবর পাওয়া মাত্রই, এই বিশেষ বাহিনীকে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হবে। সবচেয়ে বেশি ২৮৮ টি কিউআরটি থাকবে মুর্শিদাবাদ জেলায়।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অশান্তি ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও করা নজরদারি থাকছে কমিশনের। এআই মাধ্যমে তৈরি করা ভিডিও পোস্ট করে কোনও রকম গুজব, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগে তৎক্ষণাৎ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও কড়া বার্তা দিয়ে রেখেছে নির্বাচন কমিশন।
উল্লেখ্য, রাজ্যে দ্বিতীয় দফায় ভোট আগামী ২৯ এপ্রিল। ভোট গণনা আগামী ৪ মে।

No comments:
Post a Comment