তিলজলার গোলাম জিলানি খান রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, শহরের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক নজরদারির একাধিক বড় প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। আগুন লাগার ঘটনার পর রাজ্য প্রশাসনের দ্রুত ও কড়া পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, নতুন সরকার কোনওভাবেই গাফিলতি বা বেআইনি কারবারকে প্রশ্রয় দিতে নারাজ।
ঘটনার পরপরই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়। প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, যে বহুতল ভবনে আগুন লাগে সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই নিয়ম না মেনে বিপজ্জনকভাবে ব্যবসায়িক কাজ চলছিল। অভিযোগ, ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না জরুরি নির্গমন পথের সঠিক ব্যবস্থা। এমনকি স্থানীয় স্তরে নিয়মিত পরিদর্শন ও নজরদারিতেও বড়সড় খামতির ইঙ্গিত মিলেছে।
এই পরিস্থিতিতেই প্রগতি ময়দান দমকল কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক গৌতম দাসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা আইন প্রয়োগে শিথিলতা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। তদন্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই বেআইনি নির্মাণ ও অগ্নি-নিরাপত্তাহীন কারখানার বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। কলকাতার একাধিক ঘিঞ্জি এলাকায় পুরনো বহুতল, গুদাম এবং ছোট কারখানাগুলির নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যেসব ভবনে নিরাপত্তা বিধি মানা হয়নি বা অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা চলছে, সেগুলির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, বহু জায়গায় দাহ্য পদার্থ মজুত থাকা সত্ত্বেও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ছিল না। কোথাও সরু সিঁড়ি, কোথাও বন্ধ জরুরি বেরোনোর পথ— সব মিলিয়ে সামান্য আগুনও মুহূর্তে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তিলজলার ঘটনায়ও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পিছনে এই গাফিলতিকেই বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, দুর্নীতি হোক বা প্রশাসনিক গাফিলতি— কোনও ক্ষেত্রেই রেয়াত করা হবে না। তাঁর নির্দেশে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, নতুন সরকার শুরু থেকেই ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা’র ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চাইছে।
এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, দিনের পর দিন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা চলতে পারে? কেন নিয়মিত নজরদারি হয়নি? কেন আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হল না?
তিলজলার আগুন তাই শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং কলকাতার ঘিঞ্জি এলাকাগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা নিরাপত্তাহীনতা ও প্রশাসনিক শৈথিল্যের নগ্ন বাস্তবকেই সামনে এনে দিল। আর সেই কারণেই এই ঘটনায় সরকারের কড়া অবস্থান এখন শহরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

No comments:
Post a Comment