স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। প্রাক্তন একাধিক শীর্ষ আধিকারিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালানোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশের পর স্কুল শিক্ষা দফতর থেকে এই সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ায় বহুদিনের আইনি জট কাটল বলে মনে করছেন প্রশাসনিক ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বিভিন্ন নথি, আর্থিক লেনদেন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার অসংগতি খতিয়ে দেখছিল। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জ গঠন কিংবা বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হওয়ায় তদন্ত কার্যত আটকে ছিল। এবার সেই বাধা সরে যাওয়ায় বিচারপর্ব দ্রুত এগোতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, স্কুল সার্ভিস কমিশন ও মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন উচ্চপদস্থ আধিকারিকের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন কমিশনের প্রাক্তন উপদেষ্টা শান্তি প্রসাদ সিনহা, প্রাক্তন চেয়ারম্যান সুবীরেশ ভট্টাচার্য, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়, প্রাক্তন চেয়ারম্যান সৌমিত্র সরকার, প্রাক্তন চেয়ারপার্সন শর্মিলা মিত্র-সহ আরও কয়েকজন আধিকারিক।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বেআইনি আর্থিক লেনদেন, প্রভাব খাটানো এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীদের অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মতো একাধিক অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। সেই কারণেই দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় ঘুষ গ্রহণ, ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ এবং অন্যকে বেআইনি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ।
প্রশাসনিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনি দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন সরকার স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে নিয়োগ দুর্নীতির মতো ঘটনায় অভিযুক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও এদিন কড়া ভাষায় জানান, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত যে-ই হোক, আইনের মুখোমুখি হতেই হবে।
এই মামলায় ইতিমধ্যেই বহু নথি, ডিজিটাল তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের খতিয়ান তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে বিপুল অঙ্কের টাকা আদানপ্রদান হয়েছিল এবং নিয়োগ তালিকায় অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ঘটনাও সামনে এসেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে মেধাতালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও চাকরি পাওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
সরকারি অনুমোদনের কপি স্বরাষ্ট্র দফতর, রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের দফতর, তদন্তকারী সংস্থা এবং মুখ্যসচিবের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট আদালতে দ্রুত চার্জ গঠন ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার তদন্তে নতুন গতি আনবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

No comments:
Post a Comment