কলকাতা: বঙ্গ রাজনীতিতে নজিরবিহীন ঘটনা। এমনটা যে হতে পারে, তা কেউ কল্পনা করেননি। নিউটাউনের পাঁচাতারা হোটেলে বৈঠক। তারপরই আত্মপ্রকাশ নতুন তৃণমূলের। নাম রয়েছে তৃণমূল অথচ সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নয়। এমনকি ছবিও নেই তাঁর। এরপর আবার গঠন হয়ে গেল নতুন কমিটি, যার চেয়ারপার্সন অরূপ রায়। উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বেই তৈরি নতুন তৃণমূল আত্মপ্রকাশ করল সোমবার বিকেলে। যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে হাতে দল তৈরি করেছেন, তাঁকেই সরিয়ে কিনা 'নতুন তৃণমূল' তৈরি করলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-ফিরহাদরা! আর এই নিয়েই তীব্র আক্রমণ শানালেন মমতার তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে কার্যত তুলোধোনা করেন তিনি।
কুণাল বলেন, “এই গদ্দারগুলি কুনকি হাতির মতো আচরণ করছেন। সংখ্যাতত্ত্ব যাই বলুন আমরা বিচলিত নই। আমরা জানি মানুষের দরবারে গদ্দারদের কেরিয়ার শেষ। গদ্দারদের কেরিয়ার শেষ…আর একবার মানুষের দরবারে গেলে এদের কেউ ভোট দেবে না।” তাঁর সংযোজন, “পাঁচটা আঙুল পাঁচটা আকৃতির হতে পারে। কিন্তু মুষ্টি বানিয়ে আপনারা গদ্দারি করে ছেড়ে দিলেন। আপনাদের দেওয়া চ্যালেঞ্জ স্বীকার করলাম। কারণ আমাদের নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।”
তৃণমূল তৈরি করার পিছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান এবং তাঁর পরিশ্রমের কথা স্মরণ করিয়ে বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বয়সেও অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এদের জেতাতে। কতগুলি লোককে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন। আজ যে লোকগুলি বলছে তাঁর হাত থেকে দলের প্রতীক কাড়বে, আইনের লড়াই পরে হবে আগে ভগবানের দরবারে বিচার হবে। এরা মায়ের পেটে ছুরি মারতে পারে, যা মানসিকতা।”
ক্ষুব্ধ কুণালের মন্তব্য, “যে মহিলার আন্দোলনকে নিংড়ে নিয়ে এরা নিজেদের সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তি, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠা নিয়েছে তাঁর পিঠে ছুরি মারছে। এদের কেউ বিশ্বাস করবেন না। আমি সকলকে বলছি না। অনেকে ভয়ে, চাপে আছেন। আমরা হতে পারি সংখ্যায় কম। কিন্তু গর্বিত আমাদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন।”
মমতাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি প্রসঙ্গে কুণাল ঘোষের জবাব, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নাকি দল থেকে অপসারিত করা হয়েছে! এই কথা শুনলে আমাদের শুধুই হাসি পায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও পদের মোহতাজ নন, তিনি মানুষের হৃদয়ের নেত্রী। আর ঋতব্রত তো নিজেই দল থেকে বহু আগে বহিষ্কৃত হয়েছেন। ও আসলে চাটন ঋত। একজন নিজে যে দল থেকে বহিষ্কৃত, সে আবার অন্য কাউকে কী করে বহিষ্কার করবে? বাংলার মানুষের কাছে মায়ের মতো এই নেত্রীর প্রতি এমন জঘন্য অসম্মানের জবাব আগামিদিনে এ রাজ্যের মানুষই কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দেবে।"
ঋতব্রতর অতীত রাজনৈতিক অবস্থান টেনে এনে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন কুণাল ঘোষ। বিধায়ক বলেন, "এই ঋতব্রতকে দল অনেক কিছু দিয়েছে, অনেক সম্মান দিয়েছে। কত বড় মাপের গদ্দার আর বেইমান হলে মানুষ এমন আচরণ করতে পারে! যে মানুষটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে নিজের প্রতীক নিয়ে রাজনীতি করল, আজ ক্ষমতার লোভে সে-ই মমতার পিঠে ছুরি বসাচ্ছে।"
সোমবার বিকেলে নিউটাউনের একটি হোটেলে বিশেষ বৈঠকে করেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী বিধায়করা। উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বিদ্রোহী বিধায়করা। ছিলেন মমতার একসময়ের ছায়াসঙ্গী ফিরহাদ হাকিমও। এদিন অরূপ রায়কে সভাপতি করে নিউটাউনের হোটেলে বিদ্রোহীদের বৈঠক হয়। বৈঠকে ছিলেন কলকাতা পুরসভার ৫০ জন প্রাক্তন কাউন্সিলর। এছাড়াও ছিলেন মুর্শিদাবাদ, বহরমপুরের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলররাও।
নতুন তৃণমূলের নতুন কমিটি তৈরি হয়েছে এদিন। ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছে মমতার দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী ফিরহাদ হাকিমকে। একই পদে রয়েছেন অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ। নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক হলেন জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবিনা ইয়াসমিন।

No comments:
Post a Comment