পরপর ৮ খুন! ছোট-ছোট জিনিসে ক্ষুব্ধ সিরিয়াল কিলারের কীর্তি হার মানাবে থ্রিলার-সাসপেন্স সিনেমাকেও - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Wednesday, June 24, 2026

পরপর ৮ খুন! ছোট-ছোট জিনিসে ক্ষুব্ধ সিরিয়াল কিলারের কীর্তি হার মানাবে থ্রিলার-সাসপেন্স সিনেমাকেও


ন্যাশনাল ডেস্ক, ২৪ জুন ২০২৬: পর্দায় থ্রিলার সাসপেন্স সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন অনেকেই। কোনও সাইকো কিলার আর সেই রহস্য উন্মোচনে তদন্তকারীদের নানান ক্রিয়াকলাপ একরকমের উত্তেজনা তৈরি করে মন মস্তিষ্কে। কিন্তু পর্দার কাহিনী যদি বাস্তবে ধরা দেয়! তা যে মোটেও সুখকর নয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আমরা না চাইতেও অনেক কিছু ঘটে এই পৃথিবীতে। যেমন সম্প্রতি ছত্তিশগড়ের বলোদাবাজার জেলায় যে চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে, তা দেশের সবচেয়ে আলোচিত ক্রাইম থ্রিলারগুলোকেও ছাপিয়ে গেছে। গত তিন মাসের মধ্যে কাসডোলের খারভে গ্রামে ঘটে যাওয়া আটটি মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। পুলিশের মতে, ব্যক্তিগত শত্রুতা, গালিগালাজ, জমি নিয়ে বিবাদ এবং কালো জাদুর সন্দেহে গ্রামে আতঙ্কের প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠা এক 'সাইকো কিলার' নৃশংসভাবে এই সমস্ত মানুষগুলোকে খুন করেছে।


এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত সেই গ্রামেরই বাসিন্দা ৪৬ বছর বয়সী রামসহায় জয়সওয়াল। পুলিশ এই ভয়াবহ রহস্য উন্মোচন করে এবং বিষয়টি জানাজানি হতেই কেঁপে ওঠেন যে কেউ।


চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ই মে-র মধ্যে খারভে গ্রামে একের পর এক আটজন হঠাৎ মারা যান। এত অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো মৃত্যুতে গ্রামবাসীরা হতবাক হয়ে যান। ৬ই জুন, গ্রামবাসীরা এই মৃত্যুগুলোকে সন্দেহজনক বলে বর্ণনা করে এবং গ্রামের বাসিন্দা রামসহায় জয়সওয়ালকে সন্দেহভাজন জানিয়ে কাসডোল মহকুমা আধিকারিকের কাছে একটি আবেদন জমা দেন। 



বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে, রায়পুরের ইন্সপেক্টর জেনারেল অমরেশ মিশ্র এবং পুলিশ সুপার (এসপি) ওপি শর্মা অবিলম্বে একটি বিশেষ দল গঠন করেন। এরপর যা ঘটে, তা সবাইকে চমকে দেয়। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে, পুলিশ সাতজন মৃতের দেহ কবর থেকে তুলে ফরেনসিক পরীক্ষা ও ময়নাতদন্তের জন্য রায়পুরের মেকারায় পাঠিয়ে দেয়। মৃতদের মধ্যে একজন, বুধরাম জয়সওয়ালের দেহ তাঁর পরিবার আগেই দাহ করে ফেলেছিল, তাই ভিন্নভাবে প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়।


তদন্তের সময়, পুলিশের সাইবার সেল এবং স্থানীয় দল একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পায়। দেখা যায় যে, অভিযুক্ত রামসহায় গ্রামের একজন ব্যক্তির কাছ থেকে ইঁদুর মারার ওষুধের নামে 'সুহাগা' অর্থাৎ এক ধরণের মারাত্মক বিষ হাসিল করে নেয়।


পুলিশ রামসহায়কে হেফাজতে নিয়ে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে ভেঙে পড়ে। অভিযুক্ত স্বীকার করেছে যে, বিষ আনার পরে, তিনিই প্রথম গ্রামের বিপথগামী কুকুরের উপর পরীক্ষা করেছিলেন। কুকুরটি সুহাগা খেয়ে মারা গেলেই অভিযুক্ত উৎসাহিত হয়। এর পরে সে মানুষকে তার শিকার বানাতে শুরু করে।


অভিযুক্ত রামসহায় জয়সওয়াল জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে যে সে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ঠাণ্ডা মাথায়, পরিকল্পিত কৌশলের সাথে সংঘটিত করেছে। তার পদ্ধতি একই ছিল: সে শিকারকে আমন্ত্রণ জানাত, বন্ধুত্বের ভান করত এবং তারপর অ্যালকোহলে সুহাগা বিষ মিশিয়ে পান করাত।


প্রথম হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি, অভিযুক্ত বদ্রিকে তার প্রথম শিকার হিসেবে নিশানা করে। বদ্রি প্রায়ই মদ্যপানের জন্য রামসহায়কে হয়রানি ও গালিগালাজ করত। তাই, রামসহায় তাকে বিষ মেশানো অ্যালকোহল খাইয়ে মেরে ফেলে।


দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি, অভিযুক্ত বুথালুকে তার দ্বিতীয় শিকার হিসেবে নিশানা করে। গত বিধানসভা নির্বাচনের সময় বুথালুর সাথে রামসহায়ের বিরোধ ছিল। অভিযুক্ত তাকেও সুহাগা বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলে।


তৃতীয় হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ১২ই মার্চ, অভিযুক্ত তার তৃতীয় শিকার ছাট্টু রামকে খুন করে। অভিযুক্তের অভিযোগ ছিল যে ছাট্টু রাম তার স্ত্রীর প্রতি খারাপ উদ্দেশ্য পোষণ করত। তাই, প্রতিশোধ হিসেবে সে তাকেও মেরে ফেলেছে।


চতুর্থ হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২০শে মার্চ, অভিযুক্ত তার চতুর্থ শিকারকে খুন করে। জমি লেনদেন ও সামাজিক বিরোধের জেরে অভিযুক্ত একই কায়দায় বুধরামকে প্রাণে মারে।


৫ম হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ৩১শে মার্চ, অভিযুক্ত বিনোদ কুমারকে তার পঞ্চম শিকারে পরিণত করে। অভিযুক্তের অভিযোগ, বিনোদ কুমারের ক্রমাগত গালিগালেতে ক্ষুব্ধ হয়ে সে তাকে বিষপ্রয়োগ করে, যার ফলে কাসডোল হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।


৬ষ্ঠ হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২৮শে এপ্রিল, অভিযুক্ত গজানন্দকে তার ষষ্ঠ শিকার বানায়। অভিযুক্তের সন্দেহ ছিল যে গজানন্দ কালো জাদু চর্চা করত, যার কারণে সে তার ঋণ পরিশোধ করতে পারছিল না। তাই, সে তাকে বিষপ্রয়োগে খুন করে।


৭ম হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২৯শে এপ্রিল, অভিযুক্ত চৈতুরামকে তার সপ্তম শিকার হিসেবে দাবী করে। অভিযুক্ত রামসহায় চৈতুরামের কাছ থেকে ৫০,০০০ টাকা ঋণ নিয়েছিল। সুদ এবং আসল পরিশোধ এড়াতে সে চৈতুরামকে মেরে ফেলে।


৮ম হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ১৪ই মে, অভিযুক্ত মাহেত্রু রামকে তার অষ্টম এবং শেষ শিকার হিসেবে দাবী করে। অতীতের একটি বিবাদ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচনের সময় করা মাঝেমধ্যে কটুক্তির প্রতিশোধ নিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি মাহেত্রুকে তার অষ্টম শিকার হিসেবে নিশানা করে।


নবম প্রচেষ্টা ব্যর্থ: ২০২৬ সালের ১৪ই এপ্রিল, অভিযুক্ত ব্যক্তি কার্তিক নামের আরেক গ্রামবাসীকে মদে বিষ দিয়ে মারার চেষ্টা করে, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ায় কার্তিক বেঁচে যায়।


অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অভিষেক সিং, কাসডোলের এসডিওপি কৌশল কিশোর বাসনিক, ইন্সপেক্টর প্রবীণ মিঞ্জ এবং সাইবার পুলিশ স্টেশনের ইনচার্জ প্রণালী বৈদ্য এই অত্যন্ত জটিল ও ভয়াবহ মামলাটি সমাধানে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। পুলিশ এখন অভিযুক্ত রামসহায় জয়সওয়ালের বিরুদ্ধে আটটি খুন ও একটি খুনের চেষ্টা-সহ নয়টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেফতার করেছে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad