নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া: বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে জামাই ষষ্ঠী একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে থাকলেও শান্তিপুরের সুপ্রাচীন ‘বড় গোস্বামী বাড়ি’তে এই উৎসব পালন করা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। জামাই ষষ্ঠীর এই দিনে এখানকার মূল আকর্ষণ কোনও রক্তমাংসের জামাই নন বরং স্বয়ং শ্রী রাধারমণ জিউ।
বড় গোস্বামী বাড়ির সদস্য অদ্রিপ গোস্বামীর বর্ণনা অনুযায়ী, এই পুজোর পেছনে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। একসময় বাড়ির রাধারমণ জিউ বিগ্রহটি চুরি হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে বাড়ির জ্যেষ্ঠা বধূ ও প্রবীণারা কঠোর ব্রত পালনের মাধ্যমে সেই বিগ্রহ পুনরুদ্ধার করেন। অদ্রিপ জানান, পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ভাগবত পুরাণ পাঠ করে উপলব্ধি করেন যে, শ্রী রাধিকার সান্নিধ্যের অভাবেই রাধারমণ জিউ বিগ্রহটি হয়তো অন্তরহিত হয়ে কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেই সঙ্কট কাটাতে ও সংসারে পূর্ণতা আনতে ‘অষ্টধাতুর শ্রী রাধিকা’ বিগ্রহ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাঁকে রাধারমণের পাশে স্থাপন করে মিলন ঘটানো হয়।
অদ্রিপ গোস্বামী ব্যাখ্যা করেন, এই পূজাটি সাধারণ রাধাকৃষ্ণ পূজার চেয়ে আলাদা। পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস, কলিযুগে তাঁরা যেন রাধাকৃষ্ণের বিবাহের দায়িত্ব নিয়েছেন, যা আগের যুগে বা দাপর যুগে হয়নি। যেহেতু এই বিগ্রহ বাড়ির অংশ, তাই তাঁকে লৌকিক জামাই মনে করেই পরিবারের সদস্যরা জামাই ষষ্ঠীর সমস্ত নিয়ম পালন করেন।
জামাই ষষ্ঠীর দিনে পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে জামাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট রীতিগুলো মেনে চলেন। পরিবারের সদস্যরা জামাইয়ের ন্যায় রাধারমণ জিউর জন্য হাতে পাখা তৈরি করেন এবং তাঁকে হাওয়া করেন। জামাইয়ের জন্য থালা সাজিয়ে প্রসাদ নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ এখানে সুদীর্ঘকালের।
কালের বিবর্তনে পরিবেশ ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে এই উৎসব এখন বড় গোস্বামী বাড়ির একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। অদ্রিপ গোস্বামীর কথায়, আজকের দিনটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় বরং এটি বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য ও বৈষ্ণব সংস্কৃতির এক অনন্য সংমিশ্রণ। শান্তিপুরের এই অনন্য জামাই ষষ্ঠী দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে অদ্রিপ জানান, ভবিষ্যতেও তাঁরা এই ঐতিহ্য বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

No comments:
Post a Comment