বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে। দলের প্রকৃত নেতৃত্ব কার হাতে, জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহারের অধিকার কোন পক্ষের থাকবে এবং দলীয় তহবিলের নিয়ন্ত্রণ কে করবে— এই তিনটি প্রশ্নকে ঘিরেই এখন রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনা। এই জটিল পরিস্থিতির নিষ্পত্তির দায়িত্ব এখন নির্বাচন কমিশনের ওপর।
সোমবার নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরে পৌঁছে নিজেদের দাবি-সমর্থনে বিস্তৃত নথিপত্র জমা দেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। দলের পক্ষ থেকে সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাংসদ সাগরিকা ঘোষ নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে উপস্থিত হন। দলীয় সূত্রের দাবি, সাংগঠনিক কাঠামো, দলীয় সংবিধান, নেতৃত্বের বৈধতা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তের নথিসহ সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য কমিশনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে নির্বাচন কমিশন দুই দাবিদার পক্ষকেই পৃথকভাবে নোটিস পাঠিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলেছিল। কমিশনের নির্দেশ ছিল, সোমবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে লিখিত বক্তব্যের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক নথি ও আইনি প্রমাণ জমা দিতে হবে। সেই নির্দেশ মেনেই কালীঘাট শিবির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কমিশনের কাছে সমস্ত নথি জমা দেয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের গঠনতন্ত্র, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমর্থন এবং দলের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য কমিশনের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। কমিশন যাতে প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে পারে, সেই লক্ষ্যেই প্রতিটি বিষয়ে আলাদা করে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
অন্যদিকে, বিদ্রোহী শিবিরও নিজেদের দাবিতে অনড়। এর আগে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকের পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, তাঁদের পক্ষই প্রকৃত তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং তাঁদের দলের চেয়ারম্যান অরূপ রায়। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দলটি কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে এবং সেই পরিস্থিতির পরিবর্তনের লক্ষ্যেই তাঁরা সাংগঠনিক লড়াই শুরু করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের পাঠানো নির্দেশ তাঁরা পেয়েছেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিজেদের সমস্ত বক্তব্য ও নথি কমিশনের কাছে জমা দেবেন।
এই মুহূর্তে দুই পক্ষই নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন এবং দলীয় বৈধতার দাবি তুলে ধরছে। নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, দুই পক্ষের জমা দেওয়া নথি, গঠনতন্ত্র, নেতৃত্বের বৈধতা, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমর্থন এবং অন্যান্য আইনি দিক খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, রাজ্যের রাজনীতিতেও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। কারণ কমিশনের রায়ের ওপর নির্ভর করছে জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহারের অধিকার, দলীয় স্বীকৃতি, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং তহবিলের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে।
এখন গোটা রাজ্যের নজর নির্বাচন কমিশনের দিকে। দুই পক্ষের বক্তব্য, পাল্টা দাবি, নথিপত্র এবং আইনি যুক্তি বিশদভাবে পর্যালোচনা করার পরই কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে। সেই রায়ের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে, জোড়াফুল প্রতীকের প্রকৃত অধিকারী কোন শিবির এবং ভবিষ্যতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।

No comments:
Post a Comment