পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যেই বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল আসতে শুরু করেছে। ফলাফলে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)। দলটি ইতিমধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে সরকার গঠনের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। তবে রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দলের প্রতিষ্ঠাতা ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ কি এবার পিওকের 'প্রধানমন্ত্রী' হওয়ার চেষ্টা করবেন?
প্রথম দুই দফাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে পিএমএল-এন
পিওকে বিধানসভার নির্বাচন ২৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত তিন দফায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রথম দফায়, ২৭ জুলাই মিরপুর বিভাগের ১৩টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। সেখানে পিএমএল-এন ৯টি আসনে জয়ী হয়, আর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পায় ৪টি আসন।
দ্বিতীয় দফার ভোট হয় ২ আগস্ট। মুজাফফরাবাদ বিভাগ এবং উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতেও পিএমএল-এন আধিপত্য বজায় রাখে। সরকারি ও বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ঘোষিত অধিকাংশ আসনেই জয় পেয়েছে দলটি।
প্রথম দুই দফার ফল মিলিয়ে পিএমএল-এনের ঝুলিতে এসেছে প্রায় ২৩টি আসন, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তৃতীয় ও শেষ দফার ভোট ১০ আগস্ট পুঞ্চ বিভাগে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান ফলাফলেই স্পষ্ট, দলটি এককভাবেই সরকার গঠন করতে পারে।
বিধানসভার কাঠামো
পিওকে বিধানসভায় মোট ৫৩টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়। বাকি ৮টি আসন নারী, প্রযুক্তিবিদ ও ধর্মীয় প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত।
কেন নওয়াজ শরিফকে ঘিরে জল্পনা?
নির্বাচনী প্রচারের সময় মুজাফফরাবাদে এক জনসভায় নওয়াজ শরিফ বলেন, যদি পিএমএল-এন নির্বাচনে জয়ী হয়, তাহলে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে অনুরোধ করবেন, তাঁকে পিওকের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ করে দিতে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে লন্ডন থেকে পাকিস্তানে ফেরার পর নওয়াজ শরিফ সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে এলেও তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেননি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর তিনি দলের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নীতি নির্ধারণ ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তবে এবার প্রকাশ্যে পিওকের 'প্রধানমন্ত্রী' হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক জল্পনার জন্ম দিয়েছেন তিনি।
আইন কী বলছে?
পিওকের সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই ওই অঞ্চলের বাসিন্দা, ভোটার এবং বিধানসভার সদস্য হতে হবে।
বর্তমানে নওয়াজ শরিফ পাঞ্জাব প্রদেশের বাসিন্দা। তিনি পিওকের কোনো আসন থেকে নির্বাচনও করেননি এবং বিধানসভার সদস্য নন। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর সরাসরি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোনো সাংবিধানিক সুযোগ নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে কোনো আসন থেকে নির্বাচন করে জয়ী হলে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন পেলে তবেই তাঁর জন্য সেই পথ খুলতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনও পিএমএল-এনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক কৌশল নাকি বাস্তব পরিকল্পনা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নওয়াজ শরিফের এই মন্তব্য মূলত একটি নির্বাচনী কৌশল। এর উদ্দেশ্য হতে পারে পিওকের ভোটারদের মধ্যে দলের জনসমর্থন আরও বাড়ানো এবং সহানুভূতি অর্জন করা।
নির্বাচনী সাফল্যের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও কৃতিত্ব দিয়েছেন নওয়াজ শরিফকে। তিনি বলেন, এই বিজয় পিএমএল-এন সভাপতি নওয়াজ শরিফ এবং দলের নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ফল। তাঁর নেতৃত্বেই পিওকে-তে দল সফল নির্বাচনী প্রচার চালাতে সক্ষম হয়েছে।
ভারতের অবস্থান
ভারত পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয় না। নয়াদিল্লির অবস্থান অনুযায়ী, সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতের দাবি, পাকিস্তান ওই অঞ্চলের কিছু অংশ অবৈধভাবে ও জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে।

No comments:
Post a Comment