শিক্ষক দিবস উপলক্ষে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শুক্রবার নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে সরাসরি কথোপকথনে অংশ নেন তিনি। আলোচনায় উঠে আসে শিশুদের শিক্ষা, খেলাধুলা, স্ক্রিনের আসক্তি, সৃজনশীলতা, মাদকবিরোধী সচেতনতা এবং শিশুদের শৈশব রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অনুষ্ঠানের একটি মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নিজেকেই যেন শিক্ষার্থীর ভূমিকায় বসিয়ে এক শিক্ষিকার কাছে জানতে চান, ভালো বক্তা হতে গেলে কী করতে হবে?
মোদী বলেন, তিনি যদি ওই শিক্ষিকার ছাত্র হতেন এবং একজন দক্ষ বক্তা হতে চাইতেন, তাহলে কীভাবে নিজেকে তৈরি করা উচিত?
উত্তরে শিক্ষিকা প্রথমেই আত্মবিশ্বাসের কথা বলেন। তিনি জানান, ভালো বক্তা হওয়ার জন্য আত্মবিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরপর নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সেই আত্মবিশ্বাস আরও বাড়ানো যায়।
শিক্ষিকার এই উত্তর শুনে উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে হাসির পরিবেশ তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রীও হেসে ওঠেন। পরিস্থিতি আরও মজার হয়ে ওঠে যখন শিক্ষিকা হাসতে হাসতে বলেন, “স্যার, আপনার অরা দেখে আমারই আত্মবিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ হয়ে গেল!” তাঁর এই মন্তব্যে গোটা হল হাসিতে ফেটে পড়ে।
ভালো বক্তা হওয়ার জন্য কী প্রয়োজন?
শিক্ষিকার বক্তব্য অনুযায়ী, ভালো বক্তা হওয়ার দক্ষতা শুধু জন্মগত প্রতিভার বিষয় নয়। নিয়মিত অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরার অভ্যাসের মাধ্যমেও এই দক্ষতা তৈরি করা সম্ভব।
এরপর প্রধানমন্ত্রী শিশুদের বর্তমান জীবনযাপন ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
শিশুদের বাড়ছে স্ক্রিন-আসক্তি
শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, স্ক্রিন টাইম অনেক ক্ষেত্রে আসক্তির পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
তিনি শিক্ষকদের পরামর্শ দেন, শিশুদের মাঠে গিয়ে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। এখানে তিনি ভিডিও গেম নয়, বরং শারীরিকভাবে মাঠে গিয়ে খেলাধুলার কথা বলেন।
পাশাপাশি শিশুদের বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, ছবি আঁকা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম ও খেলাধুলার মতো কাজে শিশুদের যুক্ত করা গেলে তাদের স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
মাদকের বিপদ থেকে শিশুদের দূরে রাখার আহ্বান
শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী মাদকাসক্তির বিপদ নিয়েও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ছাত্রছাত্রীদের মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বড় শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কোনও শিশু কীভাবে মাদকের সংস্পর্শে চলে আসে, তা অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষকদের শিশুদের আচরণের ছোটখাটো পরিবর্তনের দিকেও নজর রাখতে হবে বলে তিনি পরামর্শ দেন।
কোনও ছাত্রের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে সাহায্য করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
শুধু পড়াশোনা নয়, শিশুদের জীবনকেও বুঝতে হবে
শিক্ষকদের ভূমিকা যে শুধু বই ও পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেই কথাও মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের শিশুদের জীবনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে হবে। তাদের মানসিকতা, আচরণ, আগ্রহ এবং সমস্যাগুলিও বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
শিশুদের শৈশব যাতে অতিরিক্ত চাপ, প্রযুক্তি বা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার কারণে হারিয়ে না যায়, সেদিকেও শিক্ষকদের বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ড্রেস কোড নিয়েও আলোচনা
আলোচনায় কিছু বড় শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ড্রেস কোড সংক্রান্ত বিষয়ও উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় কোনও নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা না দিয়েই তা কার্যকর করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
তাই কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার প্রভাব এবং শিক্ষার্থীদের ওপর তার মানসিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রসঙ্গ
কথোপকথনের সময় কাশীর সাংসদ থাকাকালীন শুরু করা স্তন ক্যানসার সচেতনতা কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, একসময় যেখানে মহিলাদের মধ্যে পরীক্ষা করানোর বিষয়ে অনীহা ছিল, এখন অনেকেই নিজেরাই এগিয়ে এসে পরীক্ষা করাচ্ছেন।
একদিনে বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে বিশ্ব রেকর্ড তৈরি হওয়ার বিষয়টিকেও তিনি এই সচেতনতা কর্মসূচির একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরেন।
সব মিলিয়ে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই আলাপচারিতায় শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং নিরাপদ শৈশবের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজ গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনটি মহান শিক্ষাবিদ ও ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণনের স্মৃতির প্রতিও শ্রদ্ধা জানানোর উপলক্ষ।

No comments:
Post a Comment