কলকাতা: শরীরে থাবা বসিয়েছিল মারণরোগ ক্যানসার। দীর্ঘ এক বছরের লড়াই শেষ। না ফেরার দেশে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়ের রবিবার রাতে মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন 'মৌচাক' খ্যাত এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। দক্ষিণ কলকাতার ঘরবাড়ি বিক্রি করে মুম্বই ছিল তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। সেখানেই চলছিল তাঁর চিকিৎসা। কিন্তু, শেষ রক্ষা হল না। জীবনমৃত্যুর লড়াইয়ে পরাজিত হলেন মিঠু। জনপ্রিয়তার একেবারে শিখরে থেকেও আচমকাই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। আর সেই দীর্ঘ অন্তরালেই চিরঘুমে চলে গেলেন বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রী।
অভিনেত্রীর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বিনোদন জগত। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে অভিনেত্রীর ছবি শেয়ার করে শোকপ্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন "মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর স্মৃতি ও তাঁর কাজ আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। গভীর শ্রদ্ধা।"
অভিনেত্রীর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ জনপ্রিয় অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক। কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছেন না তাঁর মৃত্যু। ১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত 'মৌচাক' ছবিতে প্রথমবার জুটি বাঁধেন রঞ্জিত মল্লিক ও মিঠু মুখোপাধ্যায়। সিনেমার পর্দায় সীতেশ-নীপার রসায়ন দেখে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছিল দর্শকমহলও। এরপর সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও মিঠু-রঞ্জিতের 'মৌচাক' আজও দর্শকমনে গেঁথে রয়েছে। মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের সঙ্গে সেই বহুল চর্চিত জুটিতেও আজ যতিচিহ্ন পড়ল।
মিঠু নেই, প্রথমটায় এই খবর বিশ্বাসই করতে পারেননি বর্ষীয়ান অভিনেতা। রঞ্জিত মল্লিক জানান, “ভীষণ হৃদয়বিদারক! মন থেকে মেনে নেওয়া শক্ত। কারণ মিঠু আমাদের থেকে বয়সে অনেক ছোট। এরকম একটা খবর আমার কাছে আসবে, আমি ভাবিনি। কী বলব, সেটাই বুঝতে পারছি না। এতদিন একসঙ্গে কাজ করেছি আমরা, তাই আজ যখন খবরটা শুনলাম প্রথমে একটু বিশ্বাস করতে অসুবিধে হচ্ছিল। কীভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দেব আমি বুঝতেই পারছি না।”
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তও। অভিনেত্রী জানান, "অনেক অভিনেত্রীই আসেন, একটা দারুণ পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে একসময় চলে যান। মিঠু মুখোপাধ্যায় তেমনই একজন অভিনেত্রী, যিনি হয়তো খুব বেশি কাজ করেননি, কিন্তু যতটুকু করেছিলেন তা আমাদের কাছে চিরকাল একটা অনুপ্রেরণার জায়গা হয়ে থাকবে।
সাতের দশকে বাংলা সিনেমায় মিঠু মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতি ছিল দর্শকের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। গোলপানা মিষ্টি মুখ, সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাবলীল অভিনয়ের মিশেলে পর্দায় তৈরি করেছিল নিজস্ব আবহ। অল্পদিনের অভিনয় কেরিয়ারে এমন কিছু ছবিতে কাজ করেছেন যা দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে। মিঠু অন্তরালে থাকলেও তাঁর অভিনয়শৈলী আজও বাংলা ছবির দর্শকের মনে জীবন্ত।
শুধু বাংলাই নয়, টলিউডের গণ্ডি পেরিয়ে হিন্দি ও ওড়িয়া ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বিস্তৃত মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় কেরিয়ার। তবে শেষজীবনটা লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিলেন। সুচিত্রা সেনের পর বাংলা সিনেমায় মিঠু মুখোপাধ্যায় ছিলেন একমাত্র অভিনেত্রী যিনি জনপ্রিয়তার শিখরে থেকেও অন্তরালে ছিলেন। মর্জিনা আবদুল্লা' থেকে 'মৌচাক', পর্দায় তাঁর উপস্থিতি একসময় ঝড় তুলত দর্শকের বুকে। অথচ জনপ্রিয়তার চূড়ায় থাকাকালীনই লাইট-ক্যামেরা থেকে সরে গিয়েছিলেন অন্তরালে।
১৯৭১ সালে চিত্ত বসুর 'শেষ পর্ব'-তে বড়পর্দায় তাঁর অভিষেক। বিপরীতে ছিলেন সমিত ভঞ্জ। প্রথম ছবিতেই সাফল্য পেয়েছিলেন এমনটা নয়। তবে ১৯৭৩ সালে দীনেন গুপ্তের 'মর্জিনা আবদুল্লা' দর্শকের দরবারে তাঁকে সফল অভিনেত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলে মিঠুর কেরিয়ার। যে ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজের সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখে গিয়েছেন। আর সেই নক্ষত্রের পতন হল এদিন। চিরঘুমে চলে গেলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে টলিপাড়ায়।


No comments:
Post a Comment