প্রদীপ ভট্টাচার্য, কলকাতা: বড়দের দেখলেই আমরা অনেক সময় তাঁদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করি। এটি শুধু একটি সামাজিক রীতি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রদ্ধা, বিনয়, আশীর্বাদ এবং গুরুজনের প্রতি সম্মান। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রণাম করতে গিয়ে পা-ই স্পর্শ করা হয় কেন? হাত, মাথা বা শরীরের অন্য কোনও অঙ্গ নয় কেন?
প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে মানুষের পা-কে শুধু শরীরের একটি অঙ্গ হিসেবে দেখা হয়নি। পা হল সেই অঙ্গ, যা মানুষকে মাটির সঙ্গে যুক্ত রাখে এবং জীবনের পথ চলায় এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই কোনও বয়োজ্যেষ্ঠ, গুরু বা শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির পা স্পর্শ করার অর্থ হল—“আপনার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের সামনে আমি বিনীত।”
ছোটরা যখন বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, তখন বড়রা নিজেদের দায়িত্ব ও স্নেহের কথা মনে করেন। আর ছোটরা মনে করিয়ে দেয়—
“আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে।” অর্থাৎ এটি একতরফা সম্মান নয়; এর মধ্যে রয়েছে শ্রদ্ধা ও আশীর্বাদের পারস্পরিক সম্পর্ক।
এটি মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়, শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশের সুযোগ দেয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
এছাড়াও মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে, যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, যখন কেউ বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে, সেই ব্যক্তির মধ্যে আলাদা শক্তি আসে। বিশিষ্ট মুনি-ঋষিরা বলেছেন, বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলে আলাদা শক্তি, জ্ঞান, বুদ্ধি, খ্যাতি বাড়ে।
এ তো গেল একটা বিষয়। আরও একটা বিষয় খেয়াল করে দেখবেন, এর নেপথ্যে কিন্তু রয়েছে বিজ্ঞানও। পা ছুঁয়ে প্রণাম করার ধাপকে একটি এক্সারসাইজও বলা যায়।
প্রণাম করার সময় দাঁড়িয়ে ঝুঁকতে হয়। শরীরের অর্ধেকটাই বেঁকে যায় ধনুকের মতো। তারপর হাত দিয়ে সেই ব্যক্তির পা ছোঁয়া। এক্সারসাইজও যে হচ্ছে, বুঝতে অসুবিধা হয় না। এটা আরও ভালো এক্সারসাইজ হতে পারে, যদি বাঁ হাত দিয়ে বাঁ পা, ডান হাত দিয়ে ডান পায়ে স্পর্শ করেন। আশীর্বাদও পাওয়া যাবে, সঙ্গে এক্সারসাইজও।
এর নেপথ্যে বিজ্ঞান কী ভাবে আসছে? তথ্য বলছে, প্রত্যেকের শরীরে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক শক্তি থাকে। তথ্য অনুযায়ী, শরীরের বাঁ দিকটায় নেতিবাচক শক্তি এবং ডানদিকে ইতিবাচক শক্তি থাকে। একই ভাবে উল্টোদিকের মানুষটার মধ্যেও তাই। ফলে বাঁ হাত দিয়ে বাঁ পা ছোঁয়া এবং ডান হাত দিয়ে ডান পা, ইতিবাচক ও নেতিবাচক শক্তির সার্কিটটা যেন পূর্ণ হয়। শক্তির ধারক ও বাহক- মস্তিষ্কে যে স্নায়ু থাকে, তার সঙ্গে শরীরের সংযোগও। তথ্য অনুযায়ী মূল শক্তিটা থাকে পা এবং হাতের আঙুলেই।
তবে, এখন সময় বদলেছে। মানুষের জীবনযাপন বদলেছে। কিন্তু শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও আশীর্বাদের প্রয়োজন বদলায়নি। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম তাই শুধু একটি পুরনো প্রথা নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- জীবনে যতই এগিয়ে যাই, যাঁদের কাছ থেকে ভালোবাসা, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা যেন কখনও হারিয়ে না যায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- প্রণাম হওয়া উচিৎ স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধার প্রকাশ, বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়।

No comments:
Post a Comment