বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক গবেষকদের একাধিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দূষণ শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং কৃষি ব্যবস্থার উপরও বড় প্রভাব ফেলছে।
গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে ফথালেটস, বিসফেনল, পিফাস বা তথাকথিত ‘ফরেভার কেমিক্যালস’ এবং বিভিন্ন কীটনাশকের নাম। প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, নন-স্টিক বাসন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও কৃষিক্ষেতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের মাধ্যমে এগুলি মানবদেহে প্রবেশ করছে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাসায়নিকগুলির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ক্যানসার, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা, এমনকি পুরুষ ও মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে পিফাস জাতীয় রাসায়নিককে সবচেয়ে বিপজ্জনকগুলির মধ্যে ধরা হচ্ছে। এগুলিকে ‘ফরেভার কেমিক্যালস’ বলা হয় কারণ পরিবেশে এগুলি সহজে নষ্ট হয় না। জল, মাটি এবং খাদ্যচক্রের মাধ্যমে বছরের পর বছর এগুলি শরীরে জমতে থাকে। গবেষকদের মতে, বিশ্বের বহু অঞ্চলের পানীয় জলেও এই রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় আরও দাবি করা হয়েছে, রাসায়নিক দূষণের কারণে স্বাস্থ্যখাতে বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষতির কারণে প্রতিবছর ক্ষতির পরিমাণ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আগামী কয়েক দশকে জন্মহারেও বড় প্রভাব পড়তে পারে। কিছু গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, উর্বরতা কমে যাওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে নবজাতকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে রাসায়নিক উৎপাদন কয়েকশো গুণ বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে ব্যবহৃত বিপুল সংখ্যক রাসায়নিকের মধ্যে অনেকগুলির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। গবেষকদের একাংশ মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতোই রাসায়নিক দূষণও এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর নিয়ম, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো এবং নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তির উপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া, প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত করা এবং তাজা খাবারের দিকে ঝোঁকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

No comments:
Post a Comment