প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুতর স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার সম্মুখীন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খবরে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে হামের মহামারীতে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি থেকে দেশে ৩২,০০০-এরও বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই রোগে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।
ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালসহ দেশের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো বর্তমানে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রয়েছে। শয্যার তীব্র ঘাটতির কারণে রোগীদের হাসপাতালের করিডোরে এবং মেঝেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে শিশুদের গোঙানি এবং শ্বাস নেওয়ার কষ্টের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, পরিস্থিতি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে মৃতের সংখ্যা আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এই স্বাস্থ্য সংকটের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সায়েন্স অ্যাডভাইজরের একটি বিশদ প্রতিবেদন অনুসারে, এই মহামারীটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে প্রশাসনিক ব্যর্থতারই ফল। অভিযোগ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পর গঠিত মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকাদান ব্যবস্থা একটি 'ভয়াবহ বিপর্যয়ের' শিকার হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সরকার বছরের পর বছর ধরে কার্যকরভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠিত টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থাটি পরিবর্তন করে দেয়।
ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশ ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করত, যা ছিল একটি মসৃণ ও সময়োপযোগী প্রক্রিয়া। তবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার এই ব্যবস্থাটি বন্ধ করে একটি নতুন 'উন্মুক্ত দরপত্র ব্যবস্থা' চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করে ইউনিসেফ। ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে বারবার সতর্ক করেছিলেন যে, এই নতুন পদ্ধতি টিকা সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত করতে পারে এবং দেশে মহামারীর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, এই সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষা করা হয়েছিল।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দরপত্র প্রক্রিয়াটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিলম্বের জালে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে দেশব্যাপী টিকার মজুত কমে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যোগ্য শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫৯ শতাংশ হামের টিকা পেয়েছে, যা একটি নিরাপদ সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় টিকাদানের হারের চেয়ে অনেক কম। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শেষ পর্যন্ত আগে থেকেই বিলম্বিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিগুলো বাতিল করতে বাধ্য হতে হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের মধ্যে ব্যাপক অপুষ্টি এবং দুর্বল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা রোগটিকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমেদ এবং আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোশতোক হোসেন সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা' ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন যে, জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় সম্পদ বরাদ্দ না করা হলে এই মহামারীর বিস্তার রোধ করা অসম্ভব হবে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নীতি পরিবর্তন কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্প্রদায়ের জন্য একটি শিক্ষা। সরকার কত দ্রুত তার ভুল সংশোধন করে, টিকার সরবরাহ পুনরুদ্ধার করে এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করে, তার ওপরই এখন হাজার হাজার শিশুর জীবন নির্ভর করছে।

No comments:
Post a Comment