বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে বিবেচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া এমন একটি বিষয়ে কাছাকাছি আসছে বলে মনে হচ্ছে, যা বিশ্ব কূটনীতিতে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে এই দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত আলোচনা শুরু হয়েছে। জানা গেছে, সম্প্রতি বেইজিং সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আইসিসি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। এই আলোচনার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়েছে: বিশ্বের এই তিনটি প্রধান শক্তি কি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে একটি যৌথ জোট গঠন করতে পারবে?
শক্তিশালী জোটের ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, ডোনাল্ড ট্রাম্প শি জিনপিংকে বলেছেন যে আইসিসির বিরুদ্ধে তিনটি দেশের একটি "শক্তিশালী জোট" গঠন করা উভয়ের স্বার্থেই হবে। ধারণা করা হচ্ছে, চীন এই বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথেও আলোচনা করতে পারে। মজার বিষয় হলো, বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়াকে প্রায়শই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তা সত্ত্বেও, আইসিসির বিষয়ে এই তিনটি দেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে একই রকম বলে মনে হচ্ছে।
প্রধান শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রতি কেন অসন্তুষ্ট?
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প আইসিসির কিছু বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ট্রাম্প বারবার এই আদালতকে "অপ্রয়োজনীয়" বলে অভিহিত করেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, বিশ্বের প্রধান নেতাদের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি অনেক শক্তিশালী দেশের মধ্যে অস্বস্তি বাড়িয়েছে, বিশেষ করে রাশিয়া ও ইসরায়েল-সম্পর্কিত মামলাগুলোতে আদালতের পদক্ষেপ নেওয়ার পর।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কী?
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০০২ সালের জুলাই মাসে রোম সংবিধির অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত। এই আদালত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অন্যান্য গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও বিচার করে। কোনো দেশের জাতীয় আদালত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে আইসিসি হস্তক্ষেপ করতে পারে। বর্তমানে ১২৪টি দেশ আইসিসির সদস্য। তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং ভারতের মতো প্রধান দেশগুলো এতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বিশিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে
আইসিসি অতীতে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বিশ্বনেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ২০২৩ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করার পর আদালতটি বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করে। আইসিসি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের জারি করা পরোয়ানার ভিত্তিতে ফিলিপাইনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আজ পর্যন্ত, আইসিসি ৪০ জনেরও বেশি বিশিষ্ট নেতা ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তবে, আদালতের নিজস্ব পুলিশি ব্যবস্থার অভাব অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত কার্যকর করাকে কঠিন করে তোলে।
বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব কী হবে?
যদি যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া আইসিসি-র বিরুদ্ধে একটি যৌথ কৌশল গ্রহণ করে, তবে তা আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় মোড় হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। এটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, বৈধতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে ভবিষ্যতে, এই বিষয়টি কেবল একটি আইনি বিষয়ই নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং কূটনৈতিক প্রভাবের একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

No comments:
Post a Comment