বীরভূম: এবার শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরিতে চলল বুলডোজার। জঙ্গল বাঁচাতে কড়া পদক্ষেপ বন দফতরের ৷ যাতে কোনওভাবে জঙ্গলে চারচাকা গাড়ি না প্রবেশ করতে পারে তার জন্য সোমবার মাটি কেটে বন্ধ করে দেওয়া হল পথ ৷ পাশাপাশি, হোটেল-রিসর্টের বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকেছিল সোনাঝুরি জঙ্গলের ৷ উপড়ে ফেলা হল সেই সব বিজ্ঞাপনী প্রচার সাইনবোর্ড ৷
'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' শান্তিনিকেতনে আগত পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ সোনাঝুরি জঙ্গলের খোয়াই হাট ৷ সারা বছর হাজার হাজার পর্যটকের ঢল নামে এখানে। কিন্তু, বন দফতরের জায়গায় কোনও ব্যবসায়িক হাট বসার নিয়ম নেই। এই হাট 'বেআইনি'। এছাড়া, জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ে চারচাকা গাড়ি । যত্রতত্র পড়ে থাকে প্লাস্টিক। ফলত ধ্বংস হয় জঙ্গলের পরিবেশ, নষ্ট হয় গাছ ৷ এই মর্মে জাতীয় পরিবেশ আদালতে মামলা রুজু করেছেন পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত। এই মামলায় রায় দান এখন সময়ের অপেক্ষা ।
এদিকে গত কয়েক বছরে ধরে সোনাঝুরি জঙ্গলের আশেপাশে কয়েকশো হোটেল-রিসর্ট গড়ে উঠেছে । অভিযোগ, অধিকাংশ নিয়ম বহির্ভূতভাবে হয়েছে ৷ সেই হোটেল-রিসর্টের বিজ্ঞাপনী বোর্ডে মুখ ঢেকেছিল সোনাঝুরি জঙ্গলের৷ জঙ্গল লাগোয়া রাস্তার দুই দিকে লোহার বিজ্ঞাপনী বোর্ড কংক্রিটের ঢালাই করে বসানো হয়েছিল ৷এদিন সেই সমস্ত বোর্ড উপড়ে ফেলে দেওয়া হয়৷
বোলপুরে বন দফতরের রেঞ্জার জ্যোতিষ বর্মনের নেতৃত্বে এদিন সকাল থেকে জঙ্গল বাঁচাতে কড়া পদক্ষেপ করা হয় ৷ উপস্থিত ছিলেন শান্তিনিকেতন থানার ওসি অনন্যা দে। সোনাঝুরি হাটের দায়িত্বে থাকা সুকেশ চক্রবর্তী ও হোটেল ব্যবসায়ী গণেশ ঘোষ বলেন, "খুব ভালো উদ্যোগ। আমরা প্রথম থেকেই চাইতাম হাটে যেন চারচাকা গাড়ি প্রবেশ না করে৷ সেটা বন্ধ করে দিল বন দফতর৷ যাতে আমাদের কোনও সমস্যা না হয়, সেদিকটা একটু দেখলে ভালো হয় ৷ আমাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে।"
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দিয়েছেন, সরকারি কর্মী থেকে আধিকারিকরা সংবাদমাধ্যমে কোনওরকম বক্তব্য দিতে পারবেন না ৷ তাই সোনাঝুরিতে বুলডোজার প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করেননি বন দফতরের আধিকারিকরা ৷
আনুমানিক ২০০০ সালে সোনাঝুরি জঙ্গলে গুটিকয়েক আদিবাসী শিল্পীদের তৈরি সামগ্রী ও বিশ্বভারতীর কলাভবনের পড়ুয়াদের তৈরি সামগ্রী নিয়ে হাট বসত৷ এই হাট বসিয়েছিলেন প্রয়াত আশ্রমিক শ্যামলী খাস্তগীর। তবে সেই সময় সপ্তাহে মাত্র একদিন, শনিবার বসত এই হাট৷ তাই এই হাটের আরেক নাম ছিল শনিবারের হাট ৷ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার আসার পর হাটের পরিবেশ অন্য রূপ পায়। বৃদ্ধি পেতে থাকে হাটের পরিসর। সপ্তাহে একদিনের বদলে সব দিনই বসতে শুরু করে এই হাট৷ আর অধিকাংশ বহিরাগত ব্যবসায়ী হাটে স্থান পায় বলে অভিযোগ।
আরও অভিযোগ, হাট থেকে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হত, সেই টাকা সরকারের কোন খাতে জমা পড়ত, কেউ জানেন না৷ সোনাঝুরির হাট দুর্নীতির আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে দাবী স্থানীয়দের। আর যত দিন গিয়েছে জঙ্গলে গাছের সংখ্যা কমে গিয়েছে। রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন অর্থাৎ বিজেপির সরকার আসার পরেই জঙ্গল বাঁচাতে কোমর বেঁধে নেমেছে বন দফতর৷ এছাড়া, এই হাটে আগত চারচাকা গাড়ি রাখার জন্য স্থানীয় তৃণমূল নেতা নিমাই দাস একটি পার্কিং জোন করেছিল ৷ এটি 'বেআইনি' বলে, আগেই পার্কিং বন্ধ করে দিয়েছেন বিজেপির নেতা-কর্মীরা।
উল্লেখ্য, রাজ্য সরকারের কোনও দফতরের নির্দেশে সোনাঝুরি জঙ্গলের মধ্যে খোয়াই হাট বসে, মামলার শুনানিতে এই প্রশ্নের সদুত্তর জাতীয় পরিবেশ আদালতে কেউ দিতে পারেননি ৷ এমনকি, হাটের পাশে বন বিভাগের জমি দখল করে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি হোটেল-রিসর্ট, এই তথ্যও আদালতে জমা পড়েছে ৷ এখন আদালত কী রায় দেয়, সেটা সময়ের অপেক্ষা।

No comments:
Post a Comment