কলকাতা: আজ ২৬ মে, আন্তর্জাতিক হকার দিবস। ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের অবদানকে কুর্নিশ জানিয়ে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় দিনটি। এদিকে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বাংলায় শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক তরজা। সম্প্রতি শিয়ালদহ থেকে হাওড়া, রাজ্যের দুই প্রধান স্টেশনেই হকারদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের ছবি সামনে এসেছে। আর এই আন্তর্জাতিক হকার দিবসেই উচ্ছেদ অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজ্যে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে ফুটপাথের ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। এদিন নিজের এক্স হ্যান্ডেলে হকারদের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি লেখেন, '২৬ মে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক হকার দিবসে আমার খেটে খাওয়া হকার ভাই বোনেদের জানাই অভিনন্দন।' উচ্ছেদ অভিযানের জেরে যেভাবে বহু পরিবার পথে বসছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মমতা লেখেন, 'যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেই বিজেপি সরকার হকারদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, উচ্ছেদ করছে, তাদের দোকান ভেঙে দিচ্ছে, তাদের চোখের জলকে তোয়াক্কা না করে তাদের পথে বসাচ্ছে সেটা দেখে আমি বিস্মিত, ক্রুদ্ধ, মর্মাহত। অত্যাচারীরা এর জবাব নিশ্চয়ই পাবে।'
তৃণমূল নেত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ফুটপাথের এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা স্থানীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। জোর করে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে হকারদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে তিনি লেখেন, 'আপনাদের পাশে ছিলাম, আছি, থাকব।'
তিনি লেখেন, 'উন্নয়নশীল দেশগুলির কর্মসংস্থানে এই অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রটির ভূমিকা অপরিসীম। হকাররা লাখ লাখ মানুষের স্বনির্ভরতার পথ তৈরি করেন, যার ফলে বহু নিম্নবিত্ত পরিবার কর্পোরেট বা সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর না করেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।'
তাঁর সংযোজন, 'পথচারী ও স্থায়ী দোকানদারদের অধিকার রক্ষা করার পাশাপাশি হকারদের রুটি-রুজি —এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারতে ‘স্ট্রিট ভেন্ডর (সুরক্ষা ও নিয়মকানুন) আইন, ২০১৪’ (Street Vendors Act, 2014) পাস হয়েছিল, যাতে যানজট এড়ানো যায় আবার হকারদের আকস্মিক উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা দেওয়া যায়। মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে হকারদের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি ও সুনির্দিষ্ট রূপ দিয়েছেন। গত কয়েক দশক ধরে শীর্ষ আদালতকে সংবিধানের ১৯(১)(ছ) অনুচ্ছেদ [Article 19(1)(g)] অনুযায়ী হকারদের স্বাধীনভাবে ব্যবসা বা জীবিকা অর্জনের মৌলিক অধিকার এবং জনসাধারণের পরিষ্কার ও নিরাপদ রাস্তায় চলাচলের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে।'
তিনি আরও লেখেন, 'জীবিকার অধিকার কোনও সমীক্ষা বা বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ না দিয়ে আকস্মিক বা খামখেয়ালি উচ্ছেদ করা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ (জীবন ও জীবিকার অধিকার)-এর লঙ্ঘন। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হকারদের অধিকার পরিচালনার দায়িত্ব টাউন ভেন্ডিং কমিটি (TVC)-র মতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে হতে হবে, যাতে নগর পরিকল্পনায় হকারদের নিজস্ব মতামত প্রতিফলিত হয়।'
উল্লেখ্য, সম্প্রতি স্টেশন চত্বর পরিষ্কার করার কাজে বড় পদক্ষেপ করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি হাওড়া স্টেশনের জবরদখল হটাতে আরপিএফ-এর বিশাল বাহিনী নিয়ে মেগা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় স্টেশনের সাবওয়ে এবং ডিআরএম অফিসের সামনের বেআইনি দোকান ও ঝুপড়িগুলি। ঠিক একই রকম কড়া পদক্ষেপের ছবি দেখা গিয়েছে শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরেও। রেল সূত্রের খবর, যাত্রী সুরক্ষা এবং স্টেশনের সৌন্দর্যায়নের স্বার্থেই এই বেআইনি জবরদখল মুক্ত করার সিদ্ধান্ত। এদিকে এই আকস্মিক অভিযানের জেরে রুটি-রুজি হারিয়ে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বহু প্রান্তিক ব্যবসায়ী।
একদিকে যখন এই উচ্ছেদ অভিযান চলছে দিকে দিকে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক হকার দিবসে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই পোস্টে নতুন করে তপ্ত হয়ে উঠল রাজ্য-রাজনীতি।


No comments:
Post a Comment