কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের অন্দরের ফাটল যেন ক্রমশই চওড়া হচ্ছে। মাত্র দু'দিন আগেই রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস তুলে ধরে তৃণমূল সরকারকে বিঁধেছিলেন তিনি। এবারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়। সাংসদ জানিয়েছেন, শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত পরিশ্রমী।
সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় বলেন, "শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার এ পর্যন্ত যে কাজ করেছে তাতে জনগণ খুব খুশি। সরকার সঠিক পথেই চলছে এবং এভাবেই সরকারের চলা উচিৎ। আমি শুভেন্দু অধিকারীকে অনেক দিন ধরে চিনি। শিশির দা শুভেন্দু অধিকারীর বাবা)-র সঙ্গে ৪০ বছর ধরে খুব ভালো সম্পর্ক আমার। শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও দীর্ঘ। কম বয়সে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অনেক। অত্যন্ত পরিশ্রমী।"
তিনি বলেন, "আমি এমন পরিশ্রমী নেতা খুব কমই দেখেছি। তিনি শুধু ভোর থেকে রাত পর্যন্তই কাজ করেন না, ভোর থেকে রাত পর্যন্তও কাজ করেন তিনি। শুভেন্দু না থাকলে নন্দীগ্রাম আন্দোলন সফল হতো না। অনেক দিন পর বাংলায় এমন একজন নেতা ক্ষমতায় এসেছেন।" তিনি বলেন, 'সিপিএমের আমলেও আমাদের ঘরছাড়া নেতা-কর্মীদের শুভেন্দু আশ্রয় দিয়েছিলেন। একজন অভিজ্ঞ নেতা। একেবারেই তিনি অলস নন। খুবই সক্রিয়।'
তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় আরও বলেন, “সেই একই মানুষেরা, যাঁরা ২০২৪ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে আমাদের ২৯টি আসনে জয় এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার মাত্র কয়েক মাস পরেই, যখন আরজি করের ঘটনাটি ঘটল, তখনই আমাদের বোঝা উচিৎ ছিল যে, যে মানুষেরা আমাদের এত বিপুল সমর্থন দিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন লক্ষ লক্ষ সংখ্যায় রাস্তায় নেমেছেন এবং সারারাত জেগেছেন।”
সাংসদ বলেন, “এর পেছনের বার্তাটি আমাদের বোঝা উচিৎ ছিল। জনতা বিচার চাইছিলেন। আমিও সেই সময় ট্যুইট করেছি, ধর্না দিয়েছি। দলকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, জনসাধারণের যে আওয়াজ, সেটা বুঝতে চেষ্টা করুন। বিশ্বে যেখানেই গণতন্ত্র আছে, সেখানেই যদি কোনও রাজনৈতিক দল জনগণের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করে, তবে তার পতন নিশ্চিত। আমাদের পুরো প্রশাসন এই আন্দোলনের বিবরণ গোপন ও দমন করতে ব্যস্ত ছিল। এর ঠিক বিপরীতটা করা উচিৎ ছিল। এর জন্য যে বা যারা দায়ী, তাদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো উচিৎ ছিল।”
সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়ও আই-প্যাক সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “আই-প্যাককে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। আই-প্যাক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলে টাকা নিয়েছে। মনোনয়ন চাওয়ার জন্য কারা টাকা নিয়েছিল, সে বিষয়ে কি আমাদের দলীয় নেতৃত্ব অবগত ছিল না? আমি দাবী করছি না যে সবাই টাকা দিয়েছে; দলে এখনও অনেক সৎ মানুষ আছেন। আমি তাঁদের কথা বলছি যারা এই জঘন্য কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। শুধু আই-প্যাককে দোষ দিলেই চলবে না। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের যে সকল দলীয় কর্তা, কর্মী এবং নেতারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদেরও দোষ রয়েছে।”
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গে সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় বলেন, "সাধারণ মানুষ যখন দেখলেন যে তাঁরা যাতে সঠিকভাবে ভোট দিতে পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে আড়াই লক্ষ আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে কেউ তাঁদের আটকাতে পারবে না, তখন তাঁরা আত্মবিশ্বাস ও আস্থা ফিরে পান। প্রত্যেকেই ভোটকেন্দ্রে ছুটে যান; কারও মুখেই কোনও অভিযোগ বা দ্বিধার একটি শব্দও ছিল না।"
সুখেন্দু শেখর রায় বলেছেন, “বিরোধীরা এই পরিস্থিতিটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। গণতন্ত্রে জনগণের রায়কে সর্বদা বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নিতে হয়। যদি কেউ ‘এটা হয়েছে’ বা ‘ওটা হয়েছে’ বলে লুটপাট, কারচুপি বা অন্য কোনও অসদাচরণের অভিযোগ তোলে, তবে কেউ তা বিশ্বাস করবে না বা শুনবে না। মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন: এই দল আর কতদিন টিকবে? আর কতদিন টিকবে? এখন এটাই প্রশ্ন, আর বাকি সব পুরনো কথা। একই পুরনো সুর বারবার বলার কোনও মানে হয় না। এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।”
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় এক্স মাধ্যমে রোমান সম্রাটের উদাহরণ দিয়ে লেখেন, "খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালে মার্চের 'আইডস'-এর দিন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার সেনেটের মধ্যেই ছুরিকাঘাতে নিহত হন। রোমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী 'আইডস' সাধারণত মার্চ, মে, জুলাই ও অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখকে বোঝানো হত। কিন্তু এ বছরের মে মাসের 'আইডস' আসার আগেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অসহনীয় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়েছেন।"


No comments:
Post a Comment