ওয়ার্ল্ড ডেস্ক, ১৭ মে ২০২৬: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা নদীর পর এবার গঙ্গা নদীর জল বণ্টন নিয়ে শুরু হয়েছে তরজা-বিতর্ক। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) শনিবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, গঙ্গা জল বণ্টন চুক্তির নবায়নই হবে ভারতের সঙ্গে ঢাকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি। বাংলাদেশ ভারতে কাছে দাবী করেছে, দুই দেশ যেন অবিলম্বে একটি নতুন চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু করুক, যা বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা ও চাহিদা পূরণ করে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা জল চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত হতে চলেছে। ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ গঙ্গা জল বণ্টন চুক্তি বা ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের ওপর নির্ভর করবে। নতুন চুক্তিটি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে হওয়া উচিৎ। তাছাড়া, যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন চুক্তি চূড়ান্ত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান ব্যবস্থাটি লাগু থাকা উচিৎ। আমরা আরও প্রস্তাব করছি যে, ভবিষ্যতের জল বণ্টন কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য না হয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য হওয়া উচিৎ।"
ভারত থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা গঙ্গা নদী সেখানে পদ্মা নামে পরিচিত। বাংলাদেশের ১৭ কোটি জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তাঁদের জীবিকা ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য এই নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ভারতে উৎপন্ন হয়ে মোট ৫৪টি নদী বাংলাদেশে এসে মিশেছে।
বাংলাদেশের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ স্থিত ভারতের ফারাক্কা বাঁধ শুষ্ক মৌসুমে জলের প্রবাহ কমিয়ে দেয়, যার ফলে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জল জমে যায় এবং কৃষিক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতি হয়। এর বিপরীতে, ভারত ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে, ফারাক্কা ব্যারেজের নির্মাণ মূলত হুগলি নদী থেকে জলের মুখ পরিবর্তন করে পলি পরিষ্কার করতে এবং কলকাতা বন্দরকে নৌচলাচলযোগ্য বানিয়ে রাখতে করা হয়েছিল।
গঙ্গা চুক্তি নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার পদ্মা নদীর উপর একটি মেগা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। ঢাকা বলছে, এর লক্ষ্য হল ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রভাবগুলো প্রশমিত করা। ২০৩৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন হতে চলা প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রী শহিদুদ্দিন চৌধুরী আনি বলেছেন, এই ব্যারেজটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে এবং এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে পরামর্শ করার কোনও প্রয়োজন নেই।
এই মাসের শুরুতে, তিস্তা জল-বণ্টন চুক্তিতে দেরির জন্য বিএনপি নেতারা পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন। বিএনপির তথ্য সম্পাদক আজিজুল বারি হেলাল অভিযোগ করেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বছরের পর বছর ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রস্তাবিত তিস্তা চুক্তিটি আটকে রেখেছে। হেলাল ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিজয়কেও স্বাগত জানান। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিস্তা চুক্তি নিয়ে স্থগিত আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারবে।
এইসব বিবৃতির মাঝে ভারত স্পষ্ট করেছে যে, দুই দেশের মধ্যকার জল-সংক্রান্ত সমস্ত সমস্যার সমাধান বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ফোরামের মাধ্যমেই করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমইএ) মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি নদী রয়েছে এবং আন্তঃসীমান্ত জল সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য আমাদের ইতোমধ্যেই প্ল্যাটফর্ম আছে, যেগুলোর বৈঠক নিয়মিত বিরতিতে অনুষ্ঠিত হতে থাকে।”

No comments:
Post a Comment